দেশে বেকারত্ব বেড়েছে। বিশেষ করে গ্রামে। এ তথ্য সম্প্রতি জানা গেছে, বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) জরিপে। একই প্রতিষ্ঠান গত শনিবার ‘দারিদ্র্য না কমে কেন বাড়ছে’ শিরোনামে এক অনলাইন সেমিনারের আয়োজন করে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা সেমিনারে তাদের মত তুলে ধরেন। তাতে মুখ্যত বলা হয়, চলমান অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা বিদ্যমান পরিস্থিতি জটিল করেছে। এর সাথে যোগ হয়েছে শিক্ষা খাতের সঙ্কট, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অপ্রতুলতা ইত্যাদি। ফলে আগামী দিনগুলোতে দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেন অর্থনীতিবিদরা। তারা কর্মসংস্থান বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। সেমিনারের উদঘাটন এটুকু; কিন্তু কিছু গুরুতর বিষয় অনুচ্চারিত থেকে গেছে।
সেমিনারে হোসেন জিল্লুর রহমানের উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে মূলত জরিপের তথ্য-উপাত্তই প্রাধান্য পেয়েছে। কিন্তু তার এবং অন্য অর্থনীতিবিদদের বক্তব্যে দারিদ্র্যের কারণ হিসেবে বিগত সরকারের অপশাসন-দুঃশাসনের দায় একেবারে উহ্য থেকে গেছে। এ কেবল সত্যের পাশ কাটানো নয়, জাতিকে বিভ্রান্ত করার শামিল।
অর্থনীতিতে গত ১৬ বছরের নৈরাজ্য, নির্বিচার লুটপাট, দুঃশাসনের বিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটে থাকা প্রবীণ অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বর্তমান পরিস্থিতির জন্য ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়ী করার প্রয়াস পেয়েছেন। ঠিক যেভাবে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সৃষ্ট বৈষম্য বিষয়ে তিলকে তাল করে জাতিকে বিভ্রান্ত করেছিলেন। এখন তিনি বলছেন, বর্তমান সরকার নানা সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও দারিদ্র্যদূরীকরণের উদ্যোগ নেয়নি। এ বক্তব্য যে রেহমান সোবহানের আজন্মের অ্যাক্টিভিজমের ধারাবাহিকতা তা বোঝার জন্য কারো অর্থনীতিবিদ হওয়ার দরকার হয় না।
সামান্য কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন এবং দেশের অর্থনীতির খবরাখবরে ন্যূনতম চোখ রাখেন, এমন যেকোনো মানুষের জানার কথা, গত ১৬ বছরে কিভাবে অর্থনীতির প্রাণরস নিংড়ে সেটিকে ছিবড়ে ফেলা হয়েছে। কিভাবে বানোয়াট তথ্য দিয়ে উন্নয়নের তাসের প্রাসাদ দেখানো হয়েছে জাতিকে। আজ রেহমান সোবহানরা আবারো জাতিকে বিভ্রান্ত করার সুযোগ নিতে চান; কিন্তু এখন সেই পাকিস্তান আমল নেই। দেশের মানুষ সুদৃশ্য মুখোশের আড়ালের চেহারাগুলো চিনতে পেরেছেন। ৫৪ বছরে জনমনস্তত্ত¡ পরিপক্ব হয়েছে।
অর্থনীতিকে রাজনীতির সাথে গুলিয়ে ফেলার চেয়ে বড় পাপ আর হতে পারে না। গত ১৬ বছর দেশের অর্থনীতি এ পাপে ডুবে ছিল। পিপিআরসির সেমিনারেও সেটি অস্পষ্ট থাকেনি। দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়ার পেছনে গত ১৬ বছরের অপশাসনের দায় এড়িয়ে যাওয়ার অর্থ- পতিত শাসকের রাজনীতির প্রতি আনুগত্যের প্রকাশ বললে অসত্য বলা হবে কি? মহামারী মোকাবেলায় লেজেগোবরে অবস্থাও দারিদ্র্যের অন্যতম কারণ।
আমরা চাই, অর্থনীতিবিদরা সঠিক তথ্য-উপাত্ত জাতির সামনে তুলে ধরুন। তাতে যদি দেখা যায়, সত্যি সুদিন আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ, তাতে সমস্যা নেই। জাতি বুঝে নেবে তাকে কতটা ধৈর্য ধরতে হবে অথবা কী করতে হবে। প্রকৃত চিত্রটা জানলে দেশবাসী বিভ্রান্ত হবেন না। সুশাসন নিশ্চিত হয় এমন রাজনীতি বেছে নিতে পারবে সরকার।