পাপুয়া নিউগিনিতে কর্মরত জাতিসঙ্ঘের আবাসিক সমন্বয়ক রিচার্ড এস হাওয়ার্ডকে বাংলাদেশে নতুন দূত হিসেবে নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঢাকায় বিশ্বসংস্থার পরবর্তী আবাসিক সমন্বয়ক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া এ কূটনীতিক একজন সমকামী। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে জাতিসঙ্ঘ সদর দফতর থেকে বাংলাদেশকে জানিয়ে অ্যাগ্রিমো (সম্মতি) চাওয়া হয়েছে। একটি সহযোগী দৈনিকের প্রতিবেদনে এমন উদ্বেগজনক তথ্য জানা গেছে।
কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে ওই পত্রিকাটি জানিয়েছে, রিচার্ড হাওয়ার্ড তার সমকামী সঙ্গীকে নিয়ে বাংলাদেশে আসতে চান। তবে তার অ্যাগ্রিমো অনুমোদন করা হবে কি না- এ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
জাতিসঙ্ঘের এ নিয়োগে রীতিমতো বিস্ময় প্রকাশ করেছেন কূটনৈতিক ও বিশ্লেষকরা। একজন সমকামীকে বাংলাদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্তের আগে এখানকার সামাজিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেয়া উচিত ছিল বিশ্বসংস্থার। এ দেশের সামাজিক বাস্তবতা হলো- রিচার্ড হাওয়ার্ড যদি বাংলাদেশে জাতিসঙ্ঘের দূত হিসেবে আসেন, তাহলে ইস্যুটি সাধারণ মানুষের মধ্যে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. এম শহীদুজ্জামান বলেন, জাতিসঙ্ঘের উচিত এ বিতর্কিত নিয়োগ বাতিল করা। এটি না করলে বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে রিচার্ড হাওয়ার্ডের অ্যাগ্রিমো প্রত্যাখ্যান করা।
বাংলাদেশ ও জাতিসঙ্ঘের মধ্যে সহযোগিতার বহুমাত্রিক সম্পর্ক রয়েছে। শান্তিরক্ষী মিশনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতিসঙ্ঘকে বাংলাদেশ সহযোগিতা করছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রমেও জাতিসঙ্ঘের ভূমিকা রয়েছে।
সবাই স্বীকার করেন, ফ্যাসিবাদী শাসন-উত্তর বাংলাদেশে জাতিসঙ্ঘ খুব ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। এ দিকে ড. ইউনূসের সরকার দেশে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথে রয়েছে। নির্বাচন এবং সংস্কারসহ নানা ইস্যুতে সরকারের সাথে রাজনৈতিক দল ও অংশীজনদের মাঝে মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হচ্ছে। সবমিলিয়ে সরকারের পথচলা মসৃণ নয়। এখন যদি সমকামিতার মতো একটি স্পর্শকাতর ইস্যু সামনে আসে, তা নিশ্চিতভাবে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ভালো হয়, জাতিসঙ্ঘ নতুন কোনো আবাসিক সমন্বয়ক না পাঠিয়ে ঢাকায় কর্মরত আবাসিক সমন্বয়ককে আগামী নির্বাচন পর্যন্ত রেখে দেয়া। সরকার, রাজনৈতিক দল এবং সমাজের অন্য অংশীজনদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করছেন সংস্থাটির বর্তমান প্রতিনিধি।
বাংলাদেশ একটি মুসলিমপ্রধান দেশ। এখানকার সমাজে ধর্মীয় বিধিবিধান এবং অনুশাসনের প্রতি রয়েছে প্রগাঢ় ভালোবাসা ও অনুরাগ। শুধু মুসলিম নয়, সব ধর্মের লোকজন তাদের ধর্মীয় বিধিবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এ দেশের সামাজিক রীতিনীতি এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ সম্পর্কে জাতিসঙ্ঘ ভালোভাবে অবগত। এর পরও বিশ্বসংস্থা ঠিক কী কারণে একজন সমকামীকে এখানে দূত হিসেবে নিয়োগ দিতে চাচ্ছে তা সত্যি দুর্বোধ্য। সমকামী হিসেবে রিচার্ড হাওয়ার্ড বাংলাদেশে এলজিবিটি উৎসাহিত করতে পারেন এমন সন্দেহ জাগছে।
বাংলাদেশের সমাজ-বাস্তবতায় এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ইস্যু। সামাজিক রীতিনীতি এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের চরম পরিপন্থী। এ মনোনয়ন নিয়ে আরো একটি প্রশ্ন সামনে চলে আসে। বাংলাদেশবিরোধী দেশী-বিদেশী শক্তি কি এ মনোনয়নে কলকাঠি নেড়েছে- যাতে অন্তর্বর্তী সরকার বেকায়দায় পড়ে? স্মরণযোগ্য যে, ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেন ঘটাতে ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসঙ্ঘের তৎকালীন আবাসিক প্রতিনিধি রেনাটা লক ডেসালিয়ান তৎপর ছিলেন। ওই ঘটনায় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অথৈ সাগরে নিমজ্জিত হয়। দেড় দশক হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনে পিষ্ট হন বাংলাদেশের মানুষ। বিপুল রক্তের বিনিময়ে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে হাসিনার রাহুমুক্ত হয় দেশ।
আমরা আশা করব, বিশ্বসংস্থা সিদ্ধান্তটি প্রত্যাহার করবে। তা না হলে সরকারকে এ অ্যাগ্রিমো প্রত্যাখ্যান করতে হবে। জাতিসঙ্ঘের কোনো সিদ্ধান্তে যেন বাংলাদেশের এ ক্রান্তিকালে অস্থিরতার সৃষ্টি না করে- এটিই আমাদের চাওয়া।