দেশের মানুষের কাছে সহজে বিচারিকসেবা পৌঁছে দেয়া নিয়ে আলোচনার কমতি নেই। তবে তৃণমূলের বিচারপ্রার্থীরা সহজে যাতে বিচার পেতে পারেন, সেজন্য বাতিল হওয়া উপজেলা আদালত পুনঃপ্রবর্তন এবং বিভাগীয় সদরে হাইকোর্ট বেঞ্চ গঠনের দাবি জনপরিসরে জোরালো হয়েছে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনও তাদের সুপারিশমালায় এই দু’টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করেছে।
রাজনৈতিক দলগুলোও এ দু’টি বিষয়ে একমত হয়েছে। বিচার বিভাগ বিকেন্দ্রীকরণে রাজনৈতিক দলের এই একমত হওয়া ইতিবাচক। এর ফলে দেশের মানুষের বিচার পাওয়া সহজ হবে। এর আগে বিভাগীয় সদরে হাইকোর্ট বেঞ্চ গঠনের বিষয়ে একমত হয় রাজনৈতিক দলগুলো।
এরশাদের শাসনামলে দেশে বিভাগীয় সদরে হাইকোর্ট বেঞ্চ গঠন করা হলেও তা শেষপর্যন্ত সংবিধানের দোহাই দিয়ে বাতিল করা হয়। তবে ওই সময় উপজেলা সদরে স্থায়ী আদালত গঠন করা হয়েছিল। এর সুফল গ্রামাঞ্চলের মানুষ পেতে শুরু করে। কিন্তু এরশাদ পতনের পর ১৯৯১ সালে এই ব্যবস্থাও বাতিল করে তৎকালীন সরকার। অথচ উপজেলা আদালতের মূল চেতনা ছিল বিচারপ্রার্থীর কষ্ট দূর করা, ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। বিচারপ্রার্থীকে দুর্ভোগ থেকে মুক্তি, বিচার সহজীকরণ ও মামলার চাপ কমাতে যাতে উপজেলা আদালত বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, সরকার ও সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের নানামুখী উদ্যোগ সত্ত্বেও দেশের উচ্চ ও অধস্তন আদালতে মামলাজট বেড়ে যাওয়ার হার কোনোভাবে কমছে না। বরং মামলা দায়েরের তুলনায় নিষ্পত্তি কম হওয়ায় প্রতি বছর মামলা জট বেড়েই চলেছে। ২০২৪ সালে আদালতে মামলাজট বেড়েছে দুই লাখ ১৭ হাজার চারটি। এর মধ্যে বছরের শেষ ছয় মাসে বেড়েছে এক লাখ ৩৫ হাজার ৬৪১টি। অবস্থা এত শোচনীয় যে, মামলা বৃদ্ধির এই হার গত এক যুগে সর্বোচ্চ। গত দেড় যুগে মামলাজট হয়েছে তিনগুণ। চলতি বছরের ছয় মাসে এই সংখ্যা আরো বেড়েছে, এ কথা সহজে বলা যায়।
আমাদের দেশে আদালতে মামলাজট একটি গুরুতর সমস্যা, যেখানে বিপুলসংখ্যক মামলা নিষ্পত্তির অভাবে জমে থাকে। এটি বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সাথে বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা কমিয়ে দিচ্ছে। এ সময়ে মামলাজট কমাতে বিচারক সংখ্যা বৃদ্ধি, সর্বশেষ প্রযুক্তির ব্যবহার, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
উচ্চ আদালতের বিকেন্দ্রীকরণে বিভাগীয় সদরে হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপনে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হলেও রাজধানীতে কর্মরত আইনজীবীরা এর বিরোধিতা করছেন। এ ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখা জরুরি যে, গোষ্ঠীস্বার্থের কাছে বিচারিকসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া আটকে থাকতে পারে না। এ কথা বলার অবকাশ রাখে না যে, বিভাগীয় সদরে হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপন এবং উপজেলায় স্থায়ী আদালত পুনঃপ্রবর্তন বিচার বিভাগের গতি আনতে সহায়তা করবে।
আমরা মনে করি, জাতীয় ঐকমত্যে সংস্কারের ম্যান্ডেট থাকায় অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যে যে সিদ্ধান্ত হবে, তা বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নিতে হবে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের ফসল বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে।