শিক্ষা, গবেষণা এমনকি কর্মক্ষেত্রে অপরিহার্য হয়ে উঠছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। জটিল তথ্য বিশ্লেষণ, লেখালেখি, অনুবাদ, তথ্য অনুসন্ধান কিংবা গবেষণার নানা ধাপে এআই অভাবনীয় সুবিধা এনে দিয়েছে। এর অনৈতিক ব্যবহার উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় নতুন সঙ্কট তৈরি করছে। গবেষণার বিশ্বাসযোগ্যতা, মৌলিকতা ও একাডেমিক সততা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে জ্ঞানচর্চার ভিত্তি দুর্বল করছে।
‘একাডেমিক অ্যান্ড রিসার্চ ইন্টেগ্রিটি কনক্লেভ ২০২৬’ শীর্ষক এক আলোচনায় এআইয়ের অপব্যবহার নিয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, তা গুরুতর। ওই আলোচনায় উঠে এসেছে, এআই ব্যবহার করে ভুয়া গবেষণাপত্র তৈরির প্রবণতা বাড়ছে। অর্থের বিনিময়ে ভুয়া গবেষণাপত্র তৈরি ও প্রকাশের সাথে যুক্ত ‘পেপার মিল’ চক্র এই প্রযুক্তি কাজে লাগাচ্ছে।
ভুয়া তথ্য, মনগড়া পরিসংখ্যান, অস্তিত্বহীন গবেষণা ও ভুল উদ্ধৃতি তৈরি করে এআই সহজে এমন এক ধরনের লেখা প্রস্তুত করতে পারে, যা সাধারণ পর্যালোচনায় সত্য মনে হতে পারে। ফলে প্রকৃত গবেষণাপত্রে মানুষের আস্থা কমছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো— এআইয়ের তথ্যভাণ্ডারে থাকা ভুল তথ্য পরবর্তীতে নতুন তথ্য হিসেবে সামনে আসার শঙ্কা আছে। অর্থাৎ একটি ভুল তথ্য বারবার ব্যবহারের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বিশ্বাসযোগ্যতার আবরণ পেতে পারে। গবেষণার জগতে এ ধরনের প্রবণতা বিপজ্জনক। এটি এক সময় নীতিনির্ধারণে ভুল সিদ্ধান্তের কারণ হতে পারে, যা সমাজ ও রাষ্ট্রের সমূহ ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।
এআই ব্যবহার মানেই অনৈতিকতা নয়। কোনো লেখায় এআইয়ের সহায়তা থাকলেই চৌর্যবৃত্তি বা গবেষণা জালিয়াতি হয়ে যায় না। মূল বিষয় হলো— এআই কী উদ্দেশ্যে, কী মাত্রায় এবং কিভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিই মুখ্য। তথ্য বানানো, অস্তিত্বহীন সূত্র তৈরি, অন্যের কাজ নিজের নামে চালানো কিংবা গবেষকের নিজস্ব চিন্তা ও বিশ্লেষণের পরিবর্তে পুরো কাজটি যন্ত্রের ওপর ছেড়ে দেয়া একাডেমিক সততার পরিপন্থী।
একজন শিক্ষার্থী বা গবেষক কোনো কাজ নিজে করেছেন কি না, বিষয় সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান কতটা, গবেষণার যুক্তি ও ফল বুঝেছেন কি না— এসব যাচাইয়ে মৌখিক পরীক্ষা, গবেষণার বিভিন্ন পর্যায়ের খসড়া সংরক্ষণ, তথ্য ও উপাত্তের উৎস যাচাই এবং বাস্তব সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা মূল্যায়নের পদ্ধতি জোরদার করতে হবে।
গবেষণার মূল শক্তি প্রশ্ন তোলা। অনুসন্ধান করা। নতুন কিছু আবিষ্কার করা। এআই যদি মানুষের চিন্তাশক্তির বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে শিক্ষার উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। এআইকে মানুষের বিকল্প না করে জ্ঞান, গবেষণা ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধির সহায়ক টুল হিসেবে বিবেচনা করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
গবেষণার সংবেদনশীল তথ্য বা প্রকাশের আগে গুরুত্বপূর্ণ উপাত্ত অনিরাপদ এআই প্ল্যাটফর্মে তুলে দিলে তা ভবিষ্যতে নানা সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এআই ব্যবহারে গবেষক-শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার। নিরাপদ ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তুলতে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় এআই ব্যবহারে একটি সমন্বিত কাঠামো দরকার।
মানুষের অভিজ্ঞতা, ইতিহাস, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, বিচারবোধ ও সৃজনশীলতার সমন্বয়ে প্রকৃত জ্ঞানচর্চা বিকশিত হয়। জ্ঞান সৃষ্টি কোনো যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়। এআই জ্ঞানচর্চা শক্তিশালী করতে পারে। মানুষের চিন্তার জায়গা দখল করতে পারে না। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত, এআইকে দায়িত্বশীল ব্যবহারে প্রস্তুত করা।