দেশ থেকে ফ্যাসিবাদী শক্তির অবসান হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্য থেকে এখনো ফ্যাসিবাদী অপসংস্কৃতি বিদায় নেয়নি। ফলে পতিত আওয়ামী লীগ যেমন বিরোধী রাজনৈতিক মতকে বিন্দু পরিমাণ সহ্য করেনি এখনকার ক্ষমতাসীনদের মধ্যেও কিছুটা সেই আলামতই লক্ষ করা যাচ্ছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সারা দেশে মাসব্যাপী জুলাই পদযাত্রা করছে। তারই অংশ হিসাবে তারা হবিগঞ্জে গেলে সেখানে তাদের ওপর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ন্যক্কারজনক হামলা চালায়। এতে এনসিপির শীর্ষ নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও সারজিস আলমসহ ১০ জন আহত হন।

গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়ায় আওয়ামী লীগের অন্যতম টার্গেট হয় এনসিপি নেতাকর্মীরা। আওয়ামী লীগের ছদ্মবেশী নেতাকর্মীরা এনসিপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করতে চেষ্টা করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গোপালগঞ্জে এনসিপির ওপর হামলা ছিল ভয়াবহ। এরপর চলতি জুলাই মাসের শুরুতে সাভারে এনসিপির সমাবেশে হামলা করে যুবলীগ। এখন আবার গত মঙ্গলবার হামলা করল ছাত্রদল। তবে কি এনসিপিকে নির্মূল করার যে আওয়ামী মনোবাসনা সেটা ছাত্রদল পূরণ করতে চায়?

হামলার বিষয়ে হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদল সভাপতি শাহ রাজিব আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, অপ্রীতিকর একটি ঘটনার খবর শুনেছি। এর সাথে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের কোনো সম্পর্ক নেই। শুনেছি কোনো অশালীন বক্তব্যকে ঘিরে বিক্ষুব্ধ জনতা ধাওয়া দিয়েছে।

অতীতে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগকে অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়ে এমন বক্তব্যই দিতে দেখা যেত। এনসিপির ওপর হামলার পর ছাত্রদলের এমন বক্তব্য মানুষ ছাত্রদলকে ছাত্রলীগ হয়ে ওঠার চেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে উত্তেজনাকর বক্তব্যের জেরে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর এমন হামলা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। এসব হামলা জুলাই-উত্তর বাংলাদেশের মানুষ কখনোই প্রত্যাশা করে না।

এনসিপি দেশে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জন্ম নেয়া রাজনৈতিক শক্তি। এর নেতাকর্মীরা স্বৈরাচার শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার সম্মুখ সারির যোদ্ধা। মানুষ এনসিপিকে ভালোবেসে সমর্থন দিয়ে সংসদে পর্যন্ত প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দিয়েছে। এমন একটি রাজনৈতিক শক্তিকে নিশানা করে হামলা করা ছাত্রদল কিংবা বিএনপির নেতাকর্মীদের কোনোভাবেই শোভা পায় না।

ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকে বিএনপি ও ছাত্রদলের ওপর অসংখ্যবার হামলা করেছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর থেকে শুরু করে এমন নেতাকর্মী খুব কমই পাওয়া যাবে যারা তখন আওয়ামী লীগের হামলা-মামলার শিকার হননি। এসব কারণে তখন বিএনপি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা খুব করে বলত। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর এমন কি হলো যে, বিএনপি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য হুমকি হতে চায়?

এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা আপত্তিজনক। এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছেন, হামলার সময় ঘটনাস্থলে পুলিশ ও র‌্যাব উপস্থিত থাকলেও তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে।

অতীতেও আমরা ছাত্রলীগ কিংবা আওয়ামী লীগের হামলার সময় পুলিশকে নিষ্ক্রিয় থাকতে দেখেছি। তাহলে কি পুলিশেও কোনো পরিবর্তন এলো না? পুলিশের এমন আচরণ অপ্রত্যাশিত।

চব্বিশের পর থেকে বাংলাদেশের মানুষের মনে রাজনীতি নিয়ে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। মানুষ এখন ইতিবাচক রাজনীতি দেখতে চায়। অতীতের মতো মানুষ আর হানাহানির রাজনীতি চায় না। মানুষ চায় না বিরোধী দল মানেই সরকারি দলের হামলা-মামলার শিকার হবে। সরকারি দলের সাথে বিরোধী দলের দা-কুমড়া সম্পর্ক থাকুক সেটিও মানুষ কামনা করে না।

দেশে বর্তমানে একটি প্রাণবন্ত সংসদ কার্যকর আছে-এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। আমাদের প্রত্যাশা ফ্যাসিবাদী অপসংস্কৃতি অবসানের মাধ্যমে মাঠের রাজনীতিতেও সরকার ও বিরোধী দল গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বজায় রাখবে।