নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ে অতিরিক্ত সচিব পদে সম্প্রতি মো: সামসুল আলমকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। তিনি এই সচিবালয়ের উপসচিব হিসেবে ২০১৮ সালের মার্চে চাকরি থেকে অবসরে যান। পরে বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। গত নির্বাচনের আগে গঠিত বিএনপির নির্বাচনসংক্রান্ত কমিটিতে দায়িত্ব পালন করেন। ইসিতে তার নিয়োগ রাজনৈতিক দল ও পর্যবেক্ষক মহলে উদ্বেগ ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কারণ এর ফলে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা খর্ব হবে এবং ইসির প্রতি জনগণের আস্থা বিনষ্ট হবে।

জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এটিকে ‘বিতর্কিত ও পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে অভিহিত করে। এনসিপি বলেছে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’য়ের চেষ্টা।

নির্বাচন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার একটি দৈনিককে বলেছেন, এটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। দলীয় রাজনীতি করা ব্যক্তিকে ইসির মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ করা যায় না। এর অর্থ ইসির নিরপেক্ষ চরিত্র শেষ করে দেয়া। এতে ৫ আগস্টের আগের মতো নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে না।

শুধু নির্বাচন কমিশন নয়, সাংবিধানিক যেকোনো প্রতিষ্ঠানে সর্বজনগ্রাহ্য ও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া হবে এটিই কাক্সিক্ষত। কিন্তু এবার ক্ষমতায় এসে বিএনপি তার ব্যত্যয় ঘটাচ্ছে। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা জরুরি। স্বৈরাচারী সরকার যেভাবে দলীয়করণের মাধ্যমে নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস করেছিল বিএনপিও সে পথে হাঁটবে তা কেউ আশা করে না। ২০২৪ এর আগের ১৫ বছরে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচন যেমন প্রহসনে পরিণত হয়েছিল এখন শামসুল আলমের মতো লোকদের নিয়োগের ফলে সেই ঘটনারই পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে।

ইসি যাতে প্রভাবমুক্তভাবে নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে পারে সেজন্যই প্রতিষ্ঠানটিকে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের নির্দিষ্ট পদ্ধতি এবং চাকরির নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। নির্বাহী বিভাগের অধীন প্রতিষ্ঠানে সরকার ইচ্ছা করলে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে পারে। কিন্তু ইসিতে পারে না।

জুলাই বিপ্লবে সৃষ্ট জনআকাঙ্ক্ষার কথা বাদ দিলেও বিএনপি নিজে রাষ্ট্র সংস্কারের যে ৩১ দফা ঘোষণাপত্র দিয়েছিল, তাতেও দলীয়করণে বিরত থাকার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার ছিল। সেই অঙ্গীকার থেকে সরে আসা দলটির ক্ষতির কারণ হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানে প্রেষণে আমলা এবং ক্ষেত্রবিশেষে সামরিক কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেয়া হতো সেখানে বর্তমান সরকার সরাসরি দলীয় ব্যক্তিকে নিয়োগ দিচ্ছে। সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত কাউকে ইসিতে নিয়োগ দেয়ার একটিও নজির নেই; এমনকি স্বৈরাচারের ১৫ বছরেও। বিএনপি স্বৈরাচারের চেয়েও মন্দ দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে কি না এমন প্রশ্ন সঙ্গতভাবেই উঠবে।

আমরা বলতে চাই, ১৫ বছরে আওয়ামী লীগের অকথ্য দুঃশাসনে অতিষ্ঠ দেশবাসী আর সেই পীড়নযন্ত্রে ঢুকতে চায় না। তারা সরকারের প্রতিটি কার্যক্রম পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করছে। নীরবে জনমত গঠন হচ্ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জনমত সরকারের অনুকূলে থাকবে না।

ইসিকে ধ্বংস করতে না চাইলে শামসুল আলমের নিয়োগ বাতিল করতে হবে। এর বিকল্প নেই।