দেশে দেড় দশক ধরে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসন জেঁকে বসেছিল। এ জন্য চব্বিশে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। হাসিনা-উত্তর গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার, যার কাঁধে বর্তেছে দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার গুরুদায়িত্ব। এ লক্ষ্যে ড. ইউনূসের সরকার সমান্তরালভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য কাজ করছে। এই ধারাবাহিকতায় ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশন ব্যস্ত।

হাসিনার আমলে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস করায় সব নির্বাচন তামাশায় পর্যবসিত হয়। ফলে দেশে পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ভেঙে পড়ে। দেখা দেয় নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের। সেই লক্ষ্য অর্জনে অন্তর্বর্তী সরকার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর অন্যতম হচ্ছে অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করা। সবার প্রত্যাশা, ১২ ফেব্রুয়ারি তেমন একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে প্রশাসনের পক্ষপাতমূলক আচরণে এবারের নির্বাচনও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়তে পারে, এমন আশঙ্কা কয়েকটি রাজনৈতিক দলের।

যদিও এবার দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হচ্ছে না। তবু এটি দৃশ্যমান যে, আসন্ন নির্বাচনে জয়ী হতে পারে সেই দলের পক্ষে প্রশাসনের বড় একটি অংশ ঝুঁকে পড়েছে। জামায়াতে ইসলামী, অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া তরুণদের নিয়ে গঠিত এনসিপিসহ বেশ কয়েকটি দল এমন অভিযোগ তুলেছে। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে ইসি ও সরকার।

জামায়াতের আমির ডা: শফিকুর রহমানের সাথে ইউরোপীয় এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিসের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের পরিচালক পাওলা পাম্পালোনির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল গত বুধবার সৌজন্য সাক্ষাৎ করে। বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে দলটির নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মো: তাহের বলেন, গত এক-দুই সপ্তাহ ধরে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেভাবে একটি বিশেষ দলের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে এবং প্রশাসন যেভাবে একটি দলের প্রতি আনুগত্য দেখাচ্ছে, এতে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে– আগামী নির্বাচন অতীতের পাতানো নির্বাচনগুলোর মতো হবে কি না? ইসির সাথে বৈঠকে তিনি বলেন, আসন্ন সংসদ নির্বাচনের আগে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়নি। মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিশেষ দলের অনুকূলে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। বিশেষ করে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারদের (এসপি) ভূমিকার সমালোচনা করে তাদের দ্রুত বদলির দাবি জানানো হয়েছে। প্রার্থিতা বাছাইয়ে বৈষম্যের কথাও তুলে ধরেছে দলটি। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে প্রচারের ক্ষেত্রেও একটি দলকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া কোনো কোনো ব্যক্তিকে কঠোর নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে। অন্য দলের নেতাদের দেয়া হচ্ছে না।

লক্ষণীয়, একটি দলের পক্ষ থেকে ভিজিএফ কার্ড, কৃষি কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ চলছে। এতে আচরণবিধি সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন হলেও ইসি কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এত কিছুর পরও এবার আগের মতো কোনো পাতানো নির্বাচন হবে না বলে আশ্বস্ত করে গতকাল প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছেন, ‘আমরা স্বচ্ছতায় বিশ্বাসী। সবার জন্য সমান সুযোগ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করবে কমিশন।’

বলা দরকার, যদি আবার সাজানো নির্বাচন হয়, তবে দেশ অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়বে। একটি দল এমন ভুলে চব্বিশের অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। তাই দেশের স্বার্থে সবাইকে বাস্তবতা বুঝে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। যাতে ত্রয়োদশ নির্বাচন যেকোনো মূল্যে অবাধ ও সুষ্ঠু হয়। তা না হলে জাতি হিসেবে আমাদের চরম মূল্য দিতে হবে।