চব্বিশের জুলাই-আগস্টে নজিরবিহীন জনবিস্ফোরণকে কী নামে অভিহিত করা যায়; তা নিয়ে জাতি এখনো মনস্থির করতে পারেনি। সে সময় প্রতিবাদী মানুষের সংখ্যা ও তাদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশের চরিত্র এক কথায় বিরল। শেষ সময়ে সারা দেশে জুলাই আন্দোলনে কোটি কোটি মানুষ অংশ নেন। ৫ আগস্ট রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে বিপুলসংখ্যক মানুষ আন্দোলনে শামিল হন। এর প্রমাণ ওই সময় তোলা ভিডিওচিত্রে সংরিক্ষত রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় সমগ্র জনগোষ্ঠী হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসন প্রত্যাখ্যান করেছে। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রস্তাবে বাধা দেয়া হচ্ছে জনগণের ম্যান্ডেট নেই বলে। সংবিধান প্রণয়নসহ বড় বড় ইস্যু বাধার মুখে সংস্কার করা যাচ্ছে না।
হাসিনার শাসনামলে বড় বড় অন্যায়-অবিচার হয়েছে সংবিধানের দোহাই দিয়ে। নাগরিকদের গুম-খুন করাসহ আয়নাঘর সৃষ্টি ও ভোটাধিকার বঞ্চিত করা হয়েছে। মানবাধিকার রক্ষার দাবি সংবিধানে যা রক্ষিত হয়েছে; তা সরকার গায়ের জোরে মানেনি। ফলে ফ্যাসিবাদী জমানায় টানা দেড় দশক জীবন ও সম্মান রক্ষার অধিকার নাগরিকরা পাননি। এ জন্য প্রতি বছর বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের সংখ্যা বেড়েছে। অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি হাসিনা প্রত্যাখ্যান করেছেন সংবিধানের দোহাই দিয়ে। অর্থাৎ যখন জনগণের অধিকার রক্ষার কথা উত্থাপিত হয়েছে; সংবিধান রক্ষার দোহাই দিয়ে হাসিনা ওই দাবি দমিয়ে রেখেছেন। এতে প্রমাণ হয়েছে সংবিধান আসলে একগুচ্ছ কাগজ ছাড়া আর কিছু নয়। এতে থাকা লেখাজোখা কোনো কাজে আসেনি বিবেকবর্জিত ক্ষমতাসীনদের জন্য।
এখনো সংবিধান রক্ষার দোহাই দিয়ে সংস্কারে বাধা দেয়া হচ্ছে। যেখানে জুলাই আন্দোলন ছিল এর পরিষ্কার ম্যান্ডেট। আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে সংবিধান পরিবর্তনের দাবি উঠেছিল। এখন দাবি উঠেছে সংবিধান বিষয়ে গণভোট আয়োজনের। বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজিং ইনস্টিটিউট (বিইআই) সংস্কার প্রশ্নে একটি জরিপ চালায়। তাতে নানা ইস্যুতে জনভাবনা ফুটে এসেছে।
‘গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ ভবিষ্যৎ জনমানুষের ভাবনা ও প্রত্যাশা’ শিরোনামে জরিপের ফলে দেখা যাচ্ছে, ৮১ শতাংশ মানুষ সংবিধান সংশোধন প্রশ্নে গণভোট চান। জরিপে আরো কিছু বিষয়ে মানুষের স্পষ্ট মত পাওয়া গেছে। এসব রাজনৈতিক দলগুলো আমলে নিলে দেশের জন্য মঙ্গল হতে পারে। ৯৬ শতাংশ মানুষ রাজনৈতিক দলের ভেতরে সংস্কার চান। তারা দলগুলো পছন্দ করেন। কিন্তু দলের ভেতর স্বচ্ছতা প্রত্যাশা করেন। সংবিধান বদল ও সংস্কার প্রশ্নে মানুষের মনোভাব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একে যদি জনস্বার্থে কার্যকর উপাদান বানানো না যায়; তাহলে জুলাইতে হাজারো মানুষের রক্তদান ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।
সংবিধানের আলোচনায় এর বড় পরিবর্তন যাতে না হয়, এ জন্য একদল শক্ত অবস্থানে দাঁড়িয়ে গেছে। এমন একগুঁয়ে মনোভাব জুলাইয়ের পর কোনোভাবে কাম্য নয়। বাহাত্তরের সংবিধান রচনা ও গৃহীত হওয়ার বিষয়ে জনগণের ম্যান্ডেট নেয়া হয়নি। এখন একে রক্ষায় এতটা অনড় মনোভাবের কোনো কার্যকর কারণ নেই। এমনকি কোনো ভালো সংবিধানও নাগরিক কল্যাণে পরিবর্তনযোগ্য হতে পারে। তাই আমাদের সংবিধানকে জুলাই বিপ্লবের প্রত্যাশার আলোকে গড়ে নিতে হবে। এ জন্য যা যা করা দরকার তাই করতে হবে।