চরম তারল্য সঙ্কটে পড়েছে দেশের ব্যাংকিং খাত। সঙ্কট কাটাতে গত জুনে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ ধার দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘মানি মার্কেট ডাইনামিকস’ প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, গত জুন মাসেই রেপো, স্ট্যান্ডিং লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) এবং স্পেশাল লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটির মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে চার লাখ ১০ হাজার ২০২ কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই সহায়তার পরিমাণ দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এটিকে সাময়িক তারল্য ব্যবস্থাপনার স্বাভাবিক অংশ মনে হতে পারে। কিন্তু ভেতরের সত্য বড় কঠিন। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যাংক এখন স্বাবলম্বী নয়। এগুলো কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসে টিকে আছে।
সঙ্কট একদিনে তৈরি হয়নি। আওয়ামী লীগ রেজিমের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপশাসনের মাশুল গুনছে আজকের বাংলাদেশ। রাজনৈতিক উদ্দেশে ও দলীয় বিবেচনায় ঢালাওভাবে ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দেয়া হয় তখন। প্রশাসনিক ছত্রচ্ছায়ায় হয়েছে ব্যাংক দখলের মহোৎসব। দখল করা হয় ১১টি ব্যাংক। ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকে আমানতের টাকা তছরুপ এবং বিদেশে পাচার করা হয়েছে। বিদেশে গড়ে তোলা হয়েছে ব্যবসায়-বাণিজ্য ও বিলাসবহুল প্রতিষ্ঠান।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ওই মাসের জুনে খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকাশ করে অন্তর্বর্তী সরকার। জানা যায়, আওয়ামী আমলে প্রকৃত তথ্য গোপন করে খেলাপি ঋণ কম দেখানো হতো। যে কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল কম। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে জালিয়াতির সব ঋণখেলাপি হিসাবে দেখাতে শুরু করলে বেরিয়ে আসে আসল চিত্র। খেলাপি ঋণের ধাক্কায় দুর্বল হয়েছে অনেক ব্যাংক। এসব ব্যাংককে দৈনন্দিন তারল্য ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়। তবে জুন মাসে ইসলামী ব্যাংক ঘিরে সৃষ্ট অস্থিরতা, গ্রাহকদের ব্যাপক আমানত তুলে ফেলা এবং বাজারে আস্থার সঙ্কট পরিস্থিতি আরো জটিল করে। পরিস্থিতি সামলাতে কেবল জুন মাসেই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিশেষ তারল্য সহায়তার বিপুল চাপ নিতে হয়েছে। এভাবে স্বল্পমেয়াদি তারল্য জোগান দিয়ে কতদিন এই ক্ষত ঢেকে রাখা সম্ভব? কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকা ঢেলে সাময়িকভাবে ব্যাংকগুলোর প্রতিদিনের জমা বা লেনদেনের ঘাটতি মেটাতে পারে। কিন্তু আমানতকারীদের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এর জন্য আমূল সংস্কার জরুরি। যেসব দুর্বল বা অতি-দুর্বল ব্যাংক নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারছে না, সেগুলোকে কার্যকরভাবে পুনর্গঠন করতে হবে। অথবা একীভূত করা যায় কি না ভাবা যেতে পারে। এজন্য রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন গঠন করতে হবে। কমিশন বিগত সময়ের ঋণ জালিয়াতির তদন্ত করতে পারে। ইচ্ছাকৃত খেলাপির সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে কঠোর আইনি কাঠামো প্রয়োগ করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংককে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আন্তঃব্যাংক বাজারে সমতা ও আস্থা ফেরাতে আমানতকারীদের সুরক্ষা জোরদার করা জরুরি। ধ্বংস থেকে দেশের আর্থিক খাত রক্ষায় স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও পেশাদার ব্যাংকিংব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই।