আধুনিক অর্থ ব্যবস্থাপনায় ব্যাংক খাত অর্থনীতির ‘লাইফ লাইন’ হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু বাংলাদেশে পতিত শেখ হাসিনা গুরুত্বপূর্ণ এ খাত প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছে। কিছু অলিগার্ককে ব্যাংকে গচ্ছিত সাধারণ আমানতকারীর অর্থ লুটে নেয়ার অবাধ সুযোগ দেয়া হয় ওই সময়। সেই জের বর্তমানেও তীব্রভাবে বিদ্যমান। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘রেজুলিউশন স্কিম’ নামের সিদ্ধান্তে কার্যত ঋণের নামে যারা অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন, তাদের ব্যাংক লুটের দায় চাপানো হয়েছে সাধারণ আমানতকারীদের ওপর।

পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংকে গচ্ছিত আমানতের দুই বছরের মুনাফা বাতিল এবং আমানতে সরাসরি হেয়ারকাট আরোপের পদক্ষেপ শুধু আর্থিক নয়; বরং নীতিগত ও নৈতিকভাবে অত্যন্ত বিতর্কিত। এতে চুরির দায় ভুক্তভোগীর ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে। এটি ওই পাঁচ ব্যাংকের সাধারণ আমানতকারীর প্রতি অবিচারের নামান্তর। বলা যায়, বিনা দোষে কাউকে শাস্তি দেয়া।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নোটিশের বরাতে নয়া দিগন্তের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রেজুলিউশন স্কিমের ‘অভিন্ন ও সুষ্ঠু বাস্তবায়ন’ নিশ্চিত করতে এই পদক্ষেপ। ব্যাংকগুলোকে দ্রুততম সময়ে আমানত হিসাব পুনর্গণনা সম্পন্নের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এতে যারা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন না, ঋণ গ্রহণে জড়িত ছিলেন না বা কোনো অনিয়মে যুক্ত ছিলেন না- তারা আজ আর্থিক শাস্তির মুখে পড়ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত আমানত হিসাব পুনর্গণনা করা হবে বিদ্যমান স্থিতির ভিত্তিতে। ১ জানুয়ারি ২০২৪ থেকে ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত আমানতের ওপর কোনো মুনাফা গণনা করা হবে না। উপরন্তু এ হেয়ারকাটে আমানতকারীদের চূড়ান্ত স্থিতি কমিয়ে দেয়া হবে।

পতিত সরকারের ঘনিষ্ঠ গুটিকয় ব্যবসায়ী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়। বিশেষ করে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন মতে, শুধু এস আলম গ্রুপ ১৩টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে মোট সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণের নামে বের করে নিয়েছে। এই ব্যাংক লুটের সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি ছিল না বললেই চলে। তখনকার অনিয়মে ব্যাংক দুর্বল হয়েছে, এখন সেই দুর্বলতা ঢাকতে সাধারণ আমানতকারীদের ওপর বোঝা চাপানো হচ্ছে।

কেন এই অনিয়মের খেসারত সাধারণ আমানতকারীরা বহন করবেন। ব্যাংকে আমানত রাখা মানে, নির্দিষ্ট সময় শেষে নির্দিষ্ট হারে মুনাফা বা সুদ পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে। কিন্তু এখন তা কার্যত বাতিল করা হচ্ছে, যা আমানতকারীর অধিকারকে স্বীকার করে না। অন্য দিকে হেয়ারকাট মানে আমানতের একটি অংশ স্থায়ীভাবে কেটে নেয়া। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিংয়ে এটি বিরল এবং সাধারণত বড় বিনিয়োগকারী বা ঝুঁকিপূর্ণ অংশীদারদের জন্য প্রযোজ্য হয়ে থাকে; কিন্তু বাংলাদেশে চাপানো হচ্ছে সাধারণ আমানতকারীর ওপর। তাদের এটি শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

যারা হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন, তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত না করে আমানতকারীর টাকায় ঘাটতি পূরণ অগ্রহণযোগ্য। ব্যাংক লুটেরাদের জব্দকৃত সম্পদ বিক্রি করে অনায়াসে ব্যাংকের দায় শোধ করা যেত। রাষ্ট্র সম্পদ কিনে দায় শোধ করলে সাধারণ মানুষ এই ক্ষতির শিকার হতেন না। তাই এ কথা বলা অসঙ্গত হবে না যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুরো প্রক্রিয়া গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। এই সিদ্ধান্তে বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছে এই বার্তা দেবে- ঋণের নামে অর্থ আত্মসাৎ করলে তা সাধারণ আমানতকারীকে বহন করতে হবে। এটি যে ব্যাংক খাতে নৈতিক ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে, তা সহজে অনুমেয়।