ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনামলে দেশের সব খাত তছনছ হয়ে গেছে। এর মধ্যে অর্থনীতির অবস্থা বড় করুণ। পতিত সরকারের দেড় দশকের বেশি সময়ে বেপরোয়া লুটপাটে কিছু লোক আঙুল ফুলে কলাগাছ হলেও বিপুলসংখ্যক মানুষের আর্থিক অবস্থা নাজুক। সাধারণ মানুষের আয় না বাড়লেও সংসার খরচ বেড়েছে। শুধু খাবার কিনতে তাদের আয়ের ৫৫ শতাংশ ব্যয় করতে হচ্ছে। লক্ষণীয়, করোনাকাল থেকে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক জীবনে ধস নামতে শুরু করে। এর মধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে আরো নাজেহাল হয়ে পড়েছে মানুষ। নানা উদ্যোগ নেয়ার পরও অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরের বেশি সময়েও মূল্যস্ফীতি কমানো যায়নি। ২০২০ সালের করোনা মহামারীর আগে তিন দশক ধরে দেশের দারিদ্র্যের হার কমছিল। এখন দেখা যাচ্ছে তা বাড়ছে। এটি বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অগ্রযাত্রা পিছিয়ে যাওয়ার লক্ষণ। নতুন তথ্য হলো, গত তিন বছরের ব্যবধানে দেশে দারিদ্র্য কমেনি, বরং বেড়েছে। দেশে এখন দারিদ্র্যের হার ২৭ দশমিক ৯৩ বা প্রায় ২৮ শতাংশ। সরকারি হিসাবে ২০২২ সালে এ হার ছিল ১৮ দশমিক ৭। শুধু গরিব নয়, দেশে অতি দারিদ্র্যের হারও বেড়েছে। সরকারি হিসাবে ২০২২ সালের অতি দারিদ্র্যের হার ছিল ৫ দশমিক ৬। ২০২৫ সালে এসে অতি দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৫-এ। এখনো ১৮ শতাংশ পরিবার যেকোনো সময় গরিব হয়ে যেতে পারে।

গত সোমবার বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিশিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) এক গবেষণায় দারিদ্র্য ও অতি দারিদ্র্য বৃদ্ধির এই চিত্র উঠে এসেছে। ‘ইকোনমিক ডায়নামিকস অ্যান্ড মুড অ্যাট হাউজহোল্ড লেবেল ইন মিড ২০২৫’ শীর্ষক গবেষণার ফল সদ্যই প্রকাশ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জনশুমারি অনুসারে, ২০২২ সালে দেশের জনসংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ৯৮ লাখ। তখন পরিবারের সংখ্যা ছিল চার কোটি ১০ লাখ। জনসংখ্যার ওই হিসাব বিবেচনায় আনলে দেশে কমপক্ষে পৌনে পাঁচ কোটি মানুষ এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে। গত তিন বছরে জনসংখ্যা আরো বেড়েছে।

পিপিআরসি বলছে, দেশের এখন তিন ধরনের সঙ্কটের প্রভাব চলমান। এগুলো হলো, কোভিড (২০২০-২০২২), মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। সংস্থাটির গবেষণায় দেখা গেছে, তিন বছরের ব্যবধানে শহরের পরিবারের মাসিক আয় কমেছে, কিন্তু খরচ বেড়েছে। শহরের একটি পরিবারের গড়ে মাসিক আয় ৪০ হাজার ৫৭৮ টাকা। খরচ হয় ৪৪ হাজার ৯৬১ টাকা। ২০২২ সালে শহরের একটি পরিবারের মাসিক গড় আয় ছিল ৪৫ হাজার ৫৭৮ টাকা। অন্যদিকে গ্রামের পরিবারের গড় আয় কিছুটা বেড়েছে। গ্রামের একটি পরিবারের গড় আয় ২৯ হাজার ২০৫ টাকা, ব্যয় ২৭ হাজার ১৬২ টাকা। ২০২২ সালে গ্রামের পরিবারের গড় আয় ছিল ২৬ হাজার ১৬৩ টাকা।

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষুদ্র অর্থনীতির তুলনায় সামষ্টিক অর্থনীতিতে গুরুত্ব দিচ্ছে। এতে অবশ্য বেশ কিছু ইতিবাচক প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়েছে। তবে অর্থনীতির পরিকল্পনায় জনমুখী দৃষ্টি থাকা জরুরি। দেশে বেকারত্বের অধিক হারের বাস্তবতায় অবস্থান করছে। সঙ্গত কারণে কর্মসংস্থান নিয়ে বড় ধরনের ভাবনা এবং জরুরি উদ্যোগ নেয়া দরকার। জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু জিডিপির ওপর আলোচনা সীমাবদ্ধ না রেখে সমতা, ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীনতা ও জনকল্যাণের বিবেচনা থেকে অর্থনীতির পরিকল্পনা নিতে হবে।