বাংলাদেশে নদ-নদী দখল-দূষণের যেন শেষ নেই। দেশের বিভিন্ন জায়গায় যেসব নদ-নদী রয়েছে সেগুলো মানুষ দখল করে নিজেদের ইচ্ছেমতো ব্যবহার করছে। আবার অনেক নদী দূষণ করা হচ্ছে এমনভাবে যে, সেগুলো প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের নদী রক্ষা কমিশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে বটে কিন্তু নদী দখল ও দূষণ রোধে এর উপস্থিতি খুব একটা দেখা যায় না। বল যায়, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন একেবারে নির্বিকার।
খুলনার নদীগুলোর মধ্যে অন্যতম ভৈরব নদ। কিন্তু নদটি দখল-দূষণে এখন বিপর্যস্ত। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খুলনার ভৈরব নদের দু’পাশে গড়ে ওঠা বহু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা এখন নদের নাব্যতা ও পানির মান হ্রাসে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন এ নদ দিয়ে যাতায়াত করে তিন শতাধিক কার্গো ভ্যাসেল, যেগুলো থেকে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ও রাসায়নিক তরল। ফলে দিন দিন বেড়েই চলেছে দূষণ। এ ছাড়াও খুলনা সিটি করপোরেশনের অন্তত ২০টি বড় ড্রেন সরাসরি মিশছে নদে; যা দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বাসাবাড়ির বর্জ্য পড়ছে নদের পানিতে। একসময় এ নদের পানি স্থানীয়রা গৃহস্থালির কাজে অনায়াসে ব্যবহার করতেন কিন্তু এখন তা ব্যবহারের অনুপযোগী।
ভৈরব নদ দখল-দূষণ থেকে রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, এ নদ ঘিরে গড়ে উঠেছে খুলনা শিপইয়ার্ড, নৌবাহিনীর বিএএএস তিতুমীর, বিআইডব্লিউটিএ, ফরেস্ট ঘাট, নিউজ প্রিন্ট মিল, হার্ডবোর্ড মিল, ৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল, চারটি পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং তিনটি সরকারি তেল ডিপো। এ ছাড়া রয়েছে বহু বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ভৈরব নদ মরে গেলে এসব প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব বিলীনের আশঙ্কা রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে ভৈরব নদে অবৈধ স্থাপনাগুলো গড়ে উঠেছে। ফলে এগুলো চিহ্নিত হলেও উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না। নদী দখল-দূষণ রোধে সরকারি কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু এ কাজে সম্মিলিত উদ্যোগের অভাব রয়েছে। অথচ খুলনার ভৈরব নদের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা দরকার। সেই সাথে বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তাদের যোগসাজশের যে অভিযোগ উঠছে তা খতিয়ে দেখতে হবে।
নদীর দূষণ দেখার কথা পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ভৈরব নদের দূষণ রোধে তৎপর থাকলে খুলনা সিটি করপোরেশন দিনের পর দিন এ নদে বর্জ্য ফেলতে পারত না। একইভাবে নদ দিয়ে চলাচল করা পরিবহনগুলো দূষণ করা থেকে বিরত থাকত।
এ কথা সবার জানা, নদী দখলের সাথে প্রভাবশালীরা জড়িত থাকেন। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের চেয়ে কোনো ব্যক্তি-গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠান কোনো অবস্থাতেই শক্তিশালী নয়। তাদের শক্তি অকার্যকর করতে শুধু সদিচ্ছা প্রয়োজন। তবে নাগরিক সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে। সঙ্গত কারণে খুলনার ভৈরব নদের অবৈধ দখল-দূষণ রোধে সেখানকার সচেতন নাগরিকদের জেগে উঠতে হবে। এ কাজে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা, নদ-নদী দখল ও দূষণমুক্ত করে পরিচ্ছন্ন খুলনা নগরী গড়ে তুলতে সবাই উদ্যোগী হবেন।