ফ্যসিস্ট হাসিনা বাংলাদেশের মানুষকে একপ্রকার কারাগারে বন্দী করেছিল। মুষ্টিমেয় দলীয় লোকা ছাড়া দেশবাসীর কারো স্বাধীনতা ছিল না। মৌলিক মানবাধিকার লুণ্ঠন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ভোটাধিকার সম্পূর্ণ হরণ করা হয়েছিল। ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে বিচার পাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না এই সময়ে। জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার বিপুল আত্মত্যাগের বিনিময়ে এই বন্দী অবস্থা থেকে জাতি মুক্তি পেয়েছে। সে দিন হাসিনার বাহিনীর বুলেটের মুখে বুক পেতে না দিলে এই স্বাধীনতা আসত না। বিপ্লবের সময় সংঘটিত প্রতিরোধকে অপরাধ হিসেবে সামনে আনার ষড়যন্ত্র দেখা যাচ্ছে। জাতির মুক্তিদূতদের ঘাতক হিসেবে ফ্রেমিং করা হচ্ছে। আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে শত্রুরা সময়ের অপেক্ষায় রয়েছে নায়কদের জুলাই বিপ্লব সংঘটনের জন্য বিচারযোগ্য করে তুলবে।
হাসিনা ও তার সহযোগীদের একটি অংশ পালিয়ে গেলেও ফ্যাসিবাদী কাঠামো দেশে অটুট রয়েছে। আইনশৃঙ্খলাবাহিনী, মিডিয়া, বিচার ও প্রশাসনে থাকা বিশাল একটি অংশ সুযোগ পেলেই জুলাই নায়কদের বিরুদ্ধে আইনি কাঠামোর ভেতর থেকেই প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে। সম্প্রতি গাজীপুর ও হবিগঞ্জের দুটো ঘটনায় এর স্পষ্ট প্রমাণ মিলল।
প্রথম ঘটনায় জুলাইয়ের পরিচিত মুখ তাহরিমা জান্নাত সুরভীকে যেভাবে আটক করা হলো তা আশঙ্কাজনক। গভীর রাতে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে দাগি অপরাধীর মতো তাকে জবরদস্তি করে উঠিয়ে নেয়া হলো। একজন নারীকে গ্রেফতার করার জন্য গভীর রাতে পুলিশের এতটা শক্তিক্ষয় প্রশ্ন জাগায়। আদালতকেও অতি উৎসাহী ভ‚মিকা পালন করতে দেখা গেল। তাকে যখন দু’দিনের রিমান্ড দেয়া হলো, যাচাই করে দেখা হলো না তার বয়স কত। তখন তার ১৮ বছর পূর্ণ হয়নি।
প্রায় একই ধরনের সাঁড়াশি অভিযান দেখা গেল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জর জেলার সদস্যসচিব মাহদী হাসানের বিরুদ্ধে। তাকেও মধ্যরাতে অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের দু’জনের বিরুদ্ধে ত্বরিত গতিতে মামলা দায়ের ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর অভিযান পরিচালনা সন্দেহের উদ্রেক করে। ওই দুটো ঘটনার পর জুলাইয়ে রাজপথে থাকা আন্দোলনকারীদের অনেকে আবারো রাজপথে নেমে আসেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে দু’জনকে দ্রুততার সাথে মুক্তি দেয়া হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জুলাই বিপ্লবীরা রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছ থেকে বিমাতাসুলভ আচরণের মুখে পড়ছে, তাহলে পরবর্তী সরকারের সময় তাদের ওপর প্রতিশোধ গ্রহণের সংস্কৃতি যে চালু হবে না তার নিশ্চয়তা কী? এ জন্য অন্তর্বর্তী সরকার উপদেষ্টা পরিষদে জুলাইযোদ্ধাদের জন্য একটি দায়মুক্তি অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে। হাসিনার ফ্যাসিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ এর মাধ্যমে রহিত করা হয়েছে। অধ্যাদেশে পরিষ্কার করে এ কথাও বলা হয়েছে, আন্দোলনের প্রয়োজন ব্যতিরেকে জুলাইয়ের ওই সময় অন্য কোনো অপরাধ সংঘটন করা হলে তার জন্য দায়মুক্তি পাওয়া যাবে না। তবে এ ধরনের গুরুতর কোনো প্রশ্ন উঠলে সে ব্যাপারে তদন্ত করবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন।
৫ আগস্টের পর ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী ও প্রতিবেশী রাষ্ট্র একজোট হয়ে জুলাইকে কলঙ্কিত করার কোনো চেষ্টা বাদ রাখেনি। এই সময় বিপুলসংখ্যক পুলিশ হত্যা করার গুজব রটিয়ে পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা হয়েছে। এ জন্য থানায় থানায় মামলা ও গ্রেফতারও শুরু হয়ে গিয়েছিল। এ কারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে জুলাই নায়কদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা। কেবল একটি অধ্যাদেশ জারি করে তাদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা সম্ভব নয়। এ জন্য বিপ্লবের সব অংশীজনের পক্ষ থেকে উচ্চ প্রতিশ্রুতি ও তা রক্ষা করার তাগিদ দরকার।