গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে বিস্ফোরণের ঘটনায় মৃত্যু বাড়ছে। এটি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনার বিষয় নয়, বরং জাতীয় সঙ্কটের রূপ নিচ্ছে। রাজধানীর উত্তরার কামারপাড়ায় রাইডশেয়ারিং চালক রুবেলের বাসায় সম্প্রতি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা সেই নির্মম সত্যকে আবারো সামনে এনেছে।

আনন্দমুখর পারিবারিক আড্ডা মুহূর্তেই পরিণত হয় শোকাবহ ঘটনায়; অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও প্রবাসী স্বজনের মৃত্যু ঘটনাটিকে হৃদয়বিদারক করে তুলেছে। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, এমন ঘটনা এখন আর বিরল নয়। দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে প্রায়শ গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ বা বিস্ফোরণের খবর আসছে। কোথাও পুরো পরিবার দগ্ধ হচ্ছে, কোথাও শিশু বা নারী হারাচ্ছে জীবন। আবার কেউ কেউ সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্বের ভার বহন করছেন।

পরিসংখ্যান এই সঙ্কটের ভয়াবহতা আরো স্পষ্ট করে। গত ছয় বছরে দেশে প্রায় দেড় লাখ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যেগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশ গ্যাস সিলিন্ডার ও সংশ্লিষ্ট উপকরণের লিকেজজনিত। শুধু ২০২৫ সালেই সিলিন্ডারসংক্রান্ত দুর্ঘটনা ঘটে এক হাজার ৪১টি, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় তিন শ’ বেশি। ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসেই জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিয়েছেন প্রায় দুই হাজার ৭০০ দগ্ধ রোগী। এদের বড় অংশ গ্যাস লিকেজ বা সিলিন্ডার দুর্ঘটনার শিকার।

বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিম্নমানের হোসপাইপ, রেগুলেটর, ভালভ বা নজলের কারণে গ্যাস লিক হয়ে ঘরের ভেতর জমে থাকে। আগুনের সংস্পর্শে এসে বিস্ফোরণ হয়। তার চেয়েও বড় বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশে নিরাপত্তাব্যবস্থা এখনো দুর্বল। বাজারে নিম্নমানের উপকরণ অবাধে বিক্রি হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই মেয়াদোত্তীর্ণ বা জীর্ণ সিলিন্ডার ব্যবহার হচ্ছে।

এখানে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কারো নেই। শুধু ব্যবহারকারীর অসচেতনতার কথা বললেই দায় শেষ হয়ে যায় না, আবার কেবল ব্যবসায়ীদের দিকে আঙুল তুলেও সমস্যার সমাধান হয় না। সিলিন্ডার আমদানি, উৎপাদন, পুনরায় ভর্তি, পরিবহন ও বিপণনের প্রতিটি ধাপে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত পরীক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। বিস্ফোরক পরিদফতর, জ্বালানি বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বিত তদারকি ছাড়া এটি সম্ভব নয়। ব্যবহারকারীদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানো দরকার। গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের মৌলিক নিয়ম- যেমন নিয়মিত সংযোগ পরীক্ষা করা, লিকেজের গন্ধ পেলেই আগুন বা বৈদ্যুতিক সুইচ ব্যবহার না করা, রান্নাঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখা, পুরনো বা ক্ষতিগ্রস্ত হোস পাইপ দ্রুত পাল্টানো, এসব বিষয় অনেকেই জানেন না বা গুরুত্ব দেন না। তাই দেশব্যাপী সচেতনতামূলক প্রচার চালানো জরুরি।

বাসাবাড়ি, রেস্তোরাঁ, শিল্পকারখানা ও হাসপাতালের মতো স্থানে অগ্নিনিরাপত্তা বিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। নিয়মিত পরিদর্শন এবং নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই কমবে। গ্যাস সিলিন্ডার আধুনিক জীবনের অপরিহার্য জ্বালানি, বিশেষ করে যেখানে পাইপলাইনের গ্যাস পৌঁছায়নি। কিন্তু সেই সুবিধা যদি নিরাপত্তাহীনতার কারণে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়, তবে তা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।