আমাদের দেশ এখনো কৃষিপ্রধান। বাস্তবতা হলো দেশ এই সময়েও কৃষির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। দেশের কৃষিবিজ্ঞানীরা নতুন নতুন ফসলের উন্নত জাত উদ্ভাবন করে অভূতপূর্ব অবদান রাখছেন কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেই তুলনায় কৃষির আধুনিকায়ন করা সম্ভব হয়নি; বিশেষ করে কৃষি যন্ত্রপাতিতে। সেই সাথে দেশে কৃষির অগ্রগতি দ্রুততার সাথে এগিয়ে নিতে নেই পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত। তথ্য-উপাত্তের ঘাটতি পূরণে ফসলের উৎপাদন খরচ হিসাব নিশ্চিত করতে দেশের উৎপাদিত ফসলের উৎপাদন ব্যয়বিষয়ক পরিসংখ্যান প্রস্তুত ও সরবরাহ করতে একটি জরিপের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, এ জরিপ থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত কৃষি খাতে নীতি-নির্ধারণীতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
ফসল উৎপাদনের খরচ জরিপ প্রকল্পটি চলতি সালের জানুয়ারি থেকে আগামী ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত হবে। তিন বছরের এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২৭ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। যদিও পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়নে প্রকল্পের সময় আড়াই বছর করার কথা বলা হয়েছে।
দেশের ফসলের উৎপাদন খরচ, উৎপাদন হিসাব ও উৎপাদনশীলতার হিসাব নিরূপণে পরিসংখ্যান ব্যুরো থেকে এ উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। আড়াই বছরে ছয়টি প্রধান ফসল আউশ, আমন, বোরো, পাট, গম ও আলু এবং ১৪০টি অ-প্রধান ফসলের উৎপাদন খরচের তথ্য সংগ্রহ করা হবে এ জরিপের মাধ্যমে।
অবাক করা বিষয় হলো প্রায় ২৮ কোটি টাকা খরচের প্রস্তাবিত এই জরিপের ৩৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ অর্থ যাবে ভ্রমণ খাতে। যেখানে দেশের ভেতরে ৪ হাজার ৭৯৫ জনের জন্য জনপ্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে ২২ হাজার ৪০৩ টাকা।
বিবিএস বলছে, তাদের কৃষি শাখার ছয়টি প্রধান ফসলের (আউশ, আমন, বোরো, পাট, গম ও আলু) এবং ১৪০টি অ-প্রধান ফসলের আয়তন ও উৎপাদন হিসাব দেয়া হয়। সে ক্ষেত্রে মাত্র ছয়টি প্রধান ফসলের উৎপাদন হার নির্ণয়ে মাঠপর্যায়ে নমুনা ভিত্তিতে কর্তন করা হয়। ১৪০টি অ-প্রধান ফসলের হিসাব কৃষক সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে নিরূপণ করা হয়। বর্তমানে আধুনিক ও উন্নত দেশের পদ্ধতি অনুসারে ফসলের যথাযথ উৎপাদন হিসাব নিরূপণ করা হবে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ ফসলের নমুনার ভিত্তিতে মাঠপর্যায়ে শস্য কর্তন অনুষ্ঠিত হবে। তা থেকে পাওয়া ফল রিপোর্ট আকারে প্রকাশিত হবে।
আমরা মনে করি, যেকোনো খাতের উন্নয়নে সঠিক পরিকল্পনা করতে হলে প্রকৃত তথ্য-উপাত্তের বিকল্প নেই। কিন্তু আমাদের দেশে বিগত সাড়ে ১৫ বছরে ফ্যাসিবাদী জামানায় জনগণের চোখে ধুলা দিয়ে সরকারের আদেশে ফরমায়েশি তথ্য-উপাত্ত পরিবেশনে বাধ্য করা হয়েছে পরিসংখ্যান ব্যুরোকে। ফলে অর্থনৈতিক খাতের বাস্তব চিত্র জানা সম্ভব হয়নি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার অতীতের ওই কুপ্রথা ভাঙতে সচেষ্ট হয়েছে। তাই কৃষি উৎপাদন খরচ জরিপ প্রস্তুতের জন্য যে প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে তা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু প্রস্তাবিত জরিপ প্রস্তুতে ভ্রমণ খাতে যে ব্যয় বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে তা যৌক্তিক কি না তা খতিয়ে দেখা উচিত। সঙ্গত কারণে চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে অবশ্যই এ প্রকল্প নিয়ে আরো যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন।