কিশোরগঞ্জ হাওর-বাঁওড় বেষ্টিত জেলা। বর্ষায় এ জেলা পানিতে একাকার হয়ে যায়। কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার দুই গ্রাম জাফরাবাদ ও ভবানীপুর পুরোপুরি যোগাযোগ সুবিধাবঞ্চিত। নয়া দিগন্তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রাম দু’টির মানুষের যোগাযোগের একমাত্র ভরসা ডিঙি নৌকা। বৈরী আবহাওয়া ও ঝড়োবাতাসে নৌকা চালানো বিপজ্জনক হলেও যাতায়াতের বিকল্প উপায় নেই। যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থার কারণে শিশুরা নির্বিঘ্নে স্কুলে যেতে পারে না, রোগীর জরুরি চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয় এবং কৃষকের উৎপাদিত ফসলও সহজে বাজারজাত করা যায় না। এসব কারণে এ দুটি গ্রামের অনেকেই পৈতৃক ভিটেবাড়ি ছেড়ে অন্য গ্রামে চলে গেছে। স্থানীয়দের ধারণা সেতু নির্মাণ হলে এলাকাবাসীর দুঃখ ঘুচবে। তারা দীর্ঘদিন ধরে সেতু নির্মাণের দাবি করে আসছে। কিন্তু সে দাবি আজও পূরণ হয়নি।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যেকোনো এলাকার উন্নয়নের প্রধান শর্ত যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকীকরণ। কিন্তু গ্রাম দুটি সেই যোগাযোগ সুবিধা থেকেই বঞ্চিত। শেখ হাসিনার শাসনামলে গত ১৫ বছর ধরেই নিকলীতে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ছিল। তারা জাফরাবাদের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে নজর দেননি। রাজনীতিবিদরা ভোটের আগে বারবার সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিলেও তা পূরণ করেননি। ফলে গ্রামের মানুষের যাতায়াতের কষ্ট রয়েই গেছে।
৭০ বছর বয়সী আহেদ আলী ক্ষোভের সাথে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে সবাই ভোট চাইতে আসেন। তারা এসে প্রতিশ্রæতি দিয়ে যান- এখানে ব্রিজ করে দেবো, দুই গ্রামের মধ্যে রাস্তা করে দেবো। কিন্তু ভোট শেষ হলে আর সেই প্রতিশ্রুতির কথা মনে থাকে না তাদের।’
জাফরাবাদ ও ভবানীপুরের মানুষ শুধু যোগাযোগ-সুবিধাবঞ্চিতই নয়, গ্রাম দুটিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও অভাব। ফলে নদী পার হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষার্থীদের অন্যত্র শিক্ষাগ্রহণের জন্য যেতে হয়। আছে স্যানিটেশনের সমস্যাও। তবে সবকিছু ছাপিয়ে যোগাযোগের দুর্ভোগই প্রধান সমস্যা হয়ে উঠেছে সেখানে। জাফরাবাদ গ্রামের বাসিন্দা হৃদয় মাহামুদ বলেন, ‘২০২৪ সালের এইচএসসি পরীক্ষার সময়ে নৌকা না পেয়ে সাঁতরে নদী পার হওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আমার মতো অনেক শিক্ষার্থীকেই এমন ঘটনার শিকার হতে হয়েছে।’
যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন- কোনো ক্ষেত্রেই পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রত্যন্ত গ্রাম ও দুর্গম অঞ্চলগুলোতে এসবের অভাব যেন চিরস্থায়ী হয়ে আছে। গ্রামগঞ্জের সড়ক ও সেতু নির্মাণ করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। নিকলীর জাফরাবাদ ও ভবানীপুর গ্রামের মধ্যে সেতু নির্মাণে তাদের কোনো ভ‚মিকা লক্ষ করা যায়নি। আমরা গ্রাম দুটির মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনে সেতু নির্মাণের জন্য স্থানীয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
দেশে নৌ-পর্যটন ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আর কিশোরগঞ্জের নিকলী নৌ-পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্র। জাফরাবাদ ও ভবানীপুর গ্রামের যোগাযোগ ও সার্বিক উন্নয়ন সেখানকার পর্যটন ব্যবস্থা আরো বিকশিত করবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। আমরা আশা করি, জাফরাবাদ ও ভবানীপুর গ্রামের ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে স্থানীয় প্রশাসন সেখানকার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে অবিলম্বে সমাধানের যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।