নব গঠিত সরকার রাজনৈতিক বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর নিয়োগ দিয়েছে। নতুন গভর্নর মো: মোস্তাকুর রহমান গতকাল থেকে কাজ শুরু করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৪তম গভর্নর হলেন তিনি। এর আগে গত বুধবার অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া আহসান এইচ মনসুরের নিয়োগ বাতিল করে ওই দিনই নতুন গভর্নরকে চার বছরের জন্য নিয়োগ দেয় সরকার।
প্রথা ভেঙে একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর নিয়োগ দিয়ে বড় ধরনের চমক দিলো বিএনপি সরকার। এর আগে বাংলাদেশে কখনো কোনো ব্যবসায়ীকে গভর্নর পদে নিয়োগ দেয়া হয়নি। আপাদমস্তক একজন ব্যবসায়ীর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের উদাহরণ অন্যান্য দেশেও বিরল। এমন নয় যে, আইন বা নীতিমালা অনুযায়ী একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর নিয়োগ দেয়া যাবে না। গভর্নর কাকে নিয়োগ দেয়া যাবে, এ নিয়ে আইনে তেমন কিছু বলা নেই। নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগে সরকারের পছন্দই চূড়ান্ত।
আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান হিসেবে যারা দায়িত্বে আছেন, তারা সবাই খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ, আন্তর্জাতিক অর্থ-ব্যবস্থাপনায় পারদর্শী অথবা পেশাদার ব্যাংকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদের জন্য কোনো দেশই রাজনৈতিক পরিচয় বেশি গুরুত্ব দেয় না। দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা এখানে মুখ্য।
বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল দায়িত্ব হচ্ছে— ১. মুদ্রা ও ঋণনীতি ঠিক করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। ২. টাকার সরবরাহ এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, যাতে অর্থনীতি ভারসাম্যপূর্ণ ও সুস্থ থাকে। ৩. ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি করা, নিয়ম মানানো, পরিদর্শন করা এবং ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ। ৪. লেনদেন যাতে নিরাপদ ও দ্রুত হয়, সে জন্য আধুনিক ও শক্তিশালী পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলা ও পরিচালনা করা। ৫. সরকারকে আর্থিক ও অর্থনৈতিক নীতির বিষয়ে পরামর্শ দেয়া, যাতে প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও সঙ্কট মোকাবেলায় সহায়তা পাওয়া যায়। এ কাজ ঠিকভাবে আঞ্জাম দেয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান পদে অর্থনীতিবিদ, আন্তর্জাতিক অর্থ-ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কাউকে দরকার হয়।
পতিত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলে দেশে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক খাত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে পৌঁছে। ওই সময় দেশ থেকে ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যায়। ফলে সামগ্রিক অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। শেখ হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনে বাংলাদেশ ব্যাংকে আহসান এইচ মনসুরকে গভর্নর পদে নিয়োগ দেয়। দেশের ভেঙে পড়া ব্যাংক ব্যবস্থাকে দেড় বছরে তিনি টেনে তুলতে খানিকটা সক্ষম হন। সেই সাথে অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হন।
এখন দেখার বিষয়, নতুন গভর্নর কিভাবে দেশের অর্থনীতিতে সেই শৃঙ্খলায় গতি আনেন। আরো দেখার বিষয়— তিনি একজন ব্যবসায়ী হয়ে এদেশের দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেন; যে দেশে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ব্যাংক থেকে হাজারো কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আর ফেরত দেয় না। নিজে ব্যবসায়ী হয়ে স্বার্থের সঙ্ঘাত কিভাবে মোকাবেলা করবেন নতুন গভর্নর, প্রশ্নটি জোরেশোরে সামনে এসেছে।