প্রবাসী শ্রমিকরা আমাদের অর্থনীতিকে ধসেপড়া থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। রেমিট্যান্স পাঠিয়ে অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছেন। কিন্তু আমরা তাদের সবসময় যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারি না। তারা নানাভাবে শোষণ ও বঞ্চনার শিকার হন। শোষণের একটি বড় হাতিয়ার ছিল মধ্যপ্রাচ্য বিশেষত সৌদি আরবে বিমান সংস্থাগুলোর গলাকাটা টিকিটের দাম। আশপাশের দেশগুলোর তুলনায় এ দেশে বিমানের টিকিটের দাম ছয় গুণ পর্যন্ত বেশি ছিল। ফ্যাসিবাদী সরকারের আশ্রয়ে একটি সিন্ডিকেট শ্রমিকদের থেকে বাড়তি অর্থ অনেকটা লুট করে নিয়েছে বলা যায়। অন্তর্বর্তী সরকার এই সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে গলদঘর্ম হলেও শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছে।

সৌদি আরবে যেতে বিভিন্ন বিমান সংস্থার কাছ থেকে টিকিট সংগ্রহ করতে যাত্রীদের অস্বাভাবিক বেশি অর্থ দিতে হতো। শেষ পর্যন্ত টিকিটের দাম বেড়ে এক লাখ ৯০ হাজার টাকায় ওঠে। কী কারণে বাংলাদেশের যাত্রীদের এত বেশি দামে টিকিট কিনতে হবে তার কোনো সদুত্তর পাওয়া যাচ্ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকার টিকিটের উচ্চমূল্য নিয়ে তদন্ত করে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এ যাত্রায় ১১ ফেব্রুয়ারি টিকিট বুকিংয়ে কঠোর নিয়মকানুন জারি করে। বিশেষ করে সৌদি আরবের জেদ্দা, মদিনা, দাম্মাম ও রিয়াদের মতো গন্তব্যে নজরদারি শুরু করে। পরে বিমানের টিকিট বুকিং নিতে যাত্রীর নাম, পাসপোর্টের বিবরণ ও পাসপোর্টের একটি ফটোকপি প্রদান বাধ্যতামূলক করে দেয়। এতেই নাটকীয়ভাবে টিকিটের দাম কমে যায়। এখন টিকিটের দাম আমাদের পাশের দেশগুলোর দামের সমপর্যায়ে নেমে দাঁড়িয়েছে ৫০ থেকে ৪৮ হাজার টাকায়। কিছু সংস্থা দাম্মান-রিয়াদ রুটে ৩৫ হাজার টাকায়ও টিকিট বিক্রি করছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একটি চক্র আগেভাগেই সিট ব্লক করে রাখত। সবসময় তারা আসনের সঙ্কট দেখিয়ে যাত্রীদের বাধ্য করত অস্বাভাবিক বেশি দামে টিকিট কিনতে। এই পরিপ্রেক্ষিতে সরকার যাত্রীদের তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ্যে আনার বাধ্যবাধকতা আরোপ করে। এ কারণে ভুয়া নামে বুকিং রেখে কৃত্রিম টিকিটের সঙ্কট তৈরি এখন সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রকৃত যাত্রীরা কেবল টিকিটের খরিদ্দার। অথচ বছরের পর বছর ধরে সিন্ডিকেট করে বাড়তি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। সরকারের ভেতর থাকা একটি চক্র এর মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। এর সাথে বিদেশী কোম্পানিগুলোও সুযোগ নিয়েছে। অপর দিকে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া-থাকা শ্রমিকরা। গত বছরের প্রথম ছয় মাসে প্রায় আড়াই লাখ শ্রমিক সৌদি আরবে গেছেন। এ ছাড়া প্রতিনিয়ত দেশটি থেকে শ্রমিক আসছেন। এর সাথে আছেন লাখ লাখ হজযাত্রী। এই সিন্ডিকেটের কারণে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সুতরাং সিন্ডিকেটে জড়িতদের শনাক্ত করে তাদের অপরাধের বিচার করা উচিত, যাতে করে কেউ আবার সিন্ডিকেট করতে না পারে।

বিমানের টিকিট সিন্ডিকেট ভেঙে দেয়ার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার সাধুবাদ পেতেই পারে। তবে এই অসাধু চক্র যাতে কোনোভাবে আর ফিরে আসতে না পারে সে জন্য সরকারকে সব সময় সতর্ক থাকতে হবে।