ইরানে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে সৃষ্ট বিক্ষোভ নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের রূপ নিতে যাচ্ছে। এর সব কিছুই ঘটছে বাইরের শক্তি বিশেষ করে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ইরানের সাবেক স্বৈরশাসক রেজা শাহর ছেলে রেজা পাহলভি।
ইরানকে রাজনৈতিকভাবে একঘরে এবং অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করার সব রকম ব্যবস্থা করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের শক্তিগুলো। ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে গত প্রায় ৫০ বছর ধরে তারা দেশটির বিরুদ্ধে ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম অবরোধ আরোপ করে রেখেছে। একের পর এক বিক্ষোভ উসকে দিয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে ঠেলে দিয়েছে, অভ্যন্তরীণ অন্তর্ঘাতে জর্জরিত করেছে। কিন্তু ইরানি জনগণের সুদৃঢ় ঐক্য ও আধিপত্যবাদবিরোধী মনোভাব সব সময় বিজয়ী হয়েছে। তারা নতি স্বীকার করেনি। কিন্তু জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়লে রাজনীতি গৌণ হতে বাধ্য। ক্ষুধার কাছে মানুষ অসহায়। ইরানি জনগণকে সেই ক্ষুধার অস্ত্রে ঘায়েল করতে চাচ্ছে পাশ্চাত্য শক্তি।
শ্বাসরুদ্ধকর অবরোধে দেশটির অর্থনীতি কতটা নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছে তা স্পষ্ট। এক মার্কিন ডলারের দাম দাঁড়িয়েছে ১৪ লাখ ২০ হাজার ইরানি রিয়াল। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে যেকোনো দেশেই সরকার পতন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠতে পারে।
সবশেষ বিক্ষোভে এ পর্যন্ত শত শত মানুষ নিহত এবং গ্রেফতার হয়েছেন ১০ হাজারেরও বেশি। শুধু নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে এরা নিহত হননি। বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সশস্ত্র এক বা একাধিক গোষ্ঠী ঢুকে পড়েছে। ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, আন্দোলনে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ঢুকে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা চালিয়েছে।
কোনো কোনো গোষ্ঠীকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সহায়তা দিচ্ছেন। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ না করার বিষয়ে সতর্ক করে ট্রাম্প একাধিকবার ইরানে ‘হস্তক্ষেপের’ হুমকি দেন। শুধু তা-ই নয়, পাশ্চাত্যের সব রাষ্ট্র ও সংস্থা ইরানের ইসলামী বিপ্লব নস্যাতের লক্ষ্যে সক্রিয়। রেজা পাহলভি বলেছেন, তার সাথে ট্রাম্প প্রশাসনের সরাসরি যোগাযোগ আছে।
সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার বৈধ অধিকার ইরানের নির্বাচিত বৈধ সরকারের আছে। তবে দেখার বিষয়, সরকার কতটা ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার সাথে এবারের সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে পারে। সব ধরনের উসকানির মুখে যুদ্ধের প্রস্তুতির কথা বললেও ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলোচনার সুযোগ অবারিত রেখেছেন। কিন্তু সদ্যই ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক বেডরুম থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার পথে যাবে এমন ভাবার সুযোগ কম। ট্রাম্প শেষে ঘুঁটি চেলেছেন ইরানকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে। ইরানের সাথে কোনো দেশ ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবে না। করলে তাদের যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক (ট্যারিফ) দিতে হবে। এটি ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করার ব্যবস্থা।
ইরানের মিত্র হিসাবে পরিচিত চীন বা রাশিয়া এখনো নিশ্চুপ। যেমনটা ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে ঘটেছে। সুতরাং ইরানি নেতৃত্বকে একাই পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হবে। জনগণের দুর্ভোগ কমাতে হবে, তাদের ন্যায্য দাবি পূরণে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে এবং জাতীয় সংহতি অটুট রাখতে হবে। কিন্তু ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে সে অবকাশ দেবে না। অবকাশ তৈরি করে নিতে হবে।