যানবাহনের হর্ন জনজীবনে সমস্যা তৈরি করছে। রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরের ব্যস্ত রাস্তায় আশপাশে জনজীবন এর কারণে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। কোথায় কত মাত্রার হর্ন বাজানো যাবে সরকারের পক্ষ থেকে শব্দের মাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে; কিন্তু বাস্তবে কোথাও তা মানা হচ্ছে না। যারা নিয়ম ভাঙছেন তাদের বিরুদ্ধেও কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। ফলে যানবাহনের হর্নের শব্দ সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। চালকরা ইচ্ছেমতো উচ্চমাত্রার হাইড্রোলিক হর্ন বাজাচ্ছেন, যা সারা দেশে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে।

হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু জায়গায় শব্দদূষণ রোধে কঠোর নির্দেশনা আছে। রাজধানীতে নীরব এলাকায় রাতে সর্বোচ্চ ৪০ এবং দিনে ৫০ ডেসিবল গ্রহণযোগ্য মাত্রা। আবাসিক এলাকায় রাতে ৪৫ ও দিনে ৫৫ ডেসিবল সর্বোচ্চ মাত্রা। মিশ্র এলাকায় ৫০-৬০ ডেসিবলের মধ্যে। বাণিজ্যিক এলাকায় ৬০-৭০ ডেসিবল। শিল্প এলাকায় রাতে ৭০ ও দিনে সর্বোচ্চ ৭৫ ডেসিবল। বাস্তবে হর্নের শব্দের মাত্রা পাওয়া যাচ্ছে ৯৭-১১০ ডেসিবেলের মধ্যে। সারা দেশের শহর নগর বন্দরে একইভাবে যানবাহনের একই ধরনের উচ্চমাত্রার হর্ন বাজতে দেখা যায়। শব্দদূষণ নিয়ে কাজ করে এমন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের গবেষণা বলছে, প্রতি বছর গাড়ির হর্নের মাত্রা বেড়ে চলেছে। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের জরিপ আছে। তাতে দেখা গেছে, প্রতি বছর একই পয়েন্টে আগের চেয়ে বেশি মাত্রার শব্দ উৎপাদন করছে গাড়ির হর্ন।

এ দিকে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা থেকে এটি নিয়ন্ত্রণে কার্যকরভাবে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না। এসব ক্ষেত্রে গাড়ির কাগজপত্র ও চালকের সনদ নিয়ে তাদের মাথাব্যথা। কিছু ক্ষেত্রে হয়তো হর্নের বিষয়টিও আসে। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের পেছনে থাকে পুলিশের ঘুষ গ্রহণের প্রবণতা। তারা হয়তো কিছু ক্ষেত্রে উচ্চ হর্নের কারণেও গাড়ি থামিয়ে থাকে; কিন্তু এ ক্ষেত্রেও রাস্তায় গাড়ির উচ্চমাত্রার হর্ন বন্ধ করাটা তাদের লক্ষ্য থাকে না। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। তারা এ জন্য তাৎক্ষণিক জরিমানা করতে পারে। লক্ষণীয়, এই ক্ষমতার প্রয়োগ নেই। তাই ব্যস্ত সড়ক গাড়ির শব্দে সবসময় অসহনীয় অবস্থায় থাকে। নগরের মানুষ এ জন্য অতিষ্ঠ। অবস্থা এতটাই নাজুক যে, বাসাবাড়িতেও মানুষ এ জন্য স্বস্তিতে থাকতে পারেন না। প্রধানত এর শিকার রোগী ও শিক্ষার্থীরা। এ কারণে ব্যাপক হারে শহরাঞ্চলের মানুষের শ্রবণক্ষমতা কমে বধির হচ্ছেন। শব্দদূষণের প্রভাব শুধু মানুষের ওপর নয়, পশুপাখির ওপরও পড়ে। তারপরও এ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণে শিথিলতা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক।

গাড়ির হাইড্রোলিক হর্ন প্রতিরোধে শব্দদূষণ বিধিমালা-২০০৬ ও সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮-এ নির্দেশনা আছে। প্রথমবার কেউ নিয়ম লঙ্ঘন করলে এক মাস কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড এবং উভয় দণ্ডের বিধান আছে। আইনে তিন মাসের কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডসহ উভয় দণ্ড একসাথে দেয়ার বিধান আছে। এর প্রয়োগ যে হচ্ছে না, তা নিশ্চিত করে বলা যায়; হলে অসহনীয় শব্দদূষণ হতো না। ২০২৩ সালে উচ্চ আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে শব্দদূষণ বন্ধে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশসহ সরকারের সব কর্তৃপক্ষের কাছে বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগে আদেশ জারি করেন। তারপরও রাস্তায় উচ্চমাত্রার শব্দদূষণ ক্রমাগত বেড়ে চলেছে।