বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় নৈতিক নেতৃত্ব ও জবাবদিহির সঙ্কট বরাবরের; কিন্তু এর সুরাহার চেষ্টা নেতৃত্বের পর্যায় থেকে খুব কমই হয়েছে। যখন যারাই রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে তারাই নিজেদের মতো শাসন চালিয়েছে। ফলে শাসনব্যবস্থায় জনগণের প্রকৃত অংশগ্রহণ যেমন অনুপস্থিত ছিল, তেমনই নৈতিক নেতৃত্বেরও ঘাটতি দেখা গেছে। ফলে দেশ দুর্নীতি ও স্বৈরশাসনের কবলে পড়েছে। আগামীতে কেউ যাতে স্বৈরাচারী ও দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে উঠতে না পারে, সে জন্য সচেতন নাগরিক সমাজ সচেষ্ট।
গত শনিবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থটের (বিআইআইটি) উদ্যোগে ‘দ্য রোল অ্যান্ড রেসপন্সিবিলিটি অব সিভিল সোসাইটি’ শীর্ষক আলোচনায় বক্তারা বলেছেন, দেশকে ন্যায়ভিত্তিক ও উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে নৈতিক নেতৃত্ব এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। টেকসই উন্নয়ন, গণতান্ত্রিক অগ্রগতি এবং মানবকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে একটি সচেতন, সংগঠিত ও দায়িত্বশীল সিভিল সোসাইটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিআইআইটির এই আলোচনা তাৎপর্যপূর্ণ।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের আগে থেকে রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি ছিল। গণ-অভ্যুত্থানের পর সেই জন-আকাক্সক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকার বেশ কয়েকটি সংস্কার কমিশন গঠন করে। এসব কমিশন যেসব সংস্কারের সুপারিশ করেছে তার বেশকিছু ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সংস্কারে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আগামী সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোটে দেয়া হয়েছে। অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে এখন জনগণকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা আবারো স্বৈরশাসন চান, নাকি শাসনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অংশগ্রহণ চান। এই গণভোটের মাধ্যমে এটি পরিষ্কার হবে, দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন গড়ে ওঠার বীজ রয়ে যাবে নাকি তা নির্মূল হবে।
সমাজে নৈতিক নেতৃত্ব মানুষকেই তৈরি করতে হয়। আর নেতৃত্ব দেয়ার মতো নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষ তৈরি থাকলে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের দায়িত্ব হয়ে পড়ে তাদেরকে নেতৃত্বের আসনে আসীন করা। এর অন্যথা হলে শাসনের ক্ষেত্রে তাদেরকে চরম মূল্য দিতে হয়। আমরা পতিত শেখ হাসিনার শাসনামলে দেখেছি, কিভাবে শাসকগোষ্ঠী শাসনের নামে জনগণকে শোষণ করে বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়েছে। হাসিনা সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের গ্রামের বাড়িতে কুঁড়েঘর থাকলেও বিদেশে তাদের বাড়ি-গাড়ির অভাব ছিল না! কী কৌশলে আমাদের ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি করেছে, ব্যাংকের টাকা লুটপাট করে ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া অবস্থা করে গেছে- এসবই সম্ভব হয়েছে অসৎ ও অনৈতিক নেতৃত্বের কারণে।
আজ সময় এসেছে সঠিক নেতৃত্ব বাছাইয়ের। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যেন আর ব্যাংক ডাকাতি না হয়। জনগণের টাকায় যাতে আর কেউ কানাডার বেগমপাড়ায় বাড়ি করতে না পারে। সেই সুযোগ বন্ধ করতে হবে সৎ নেতৃত্ব বাছাইয়ের মাধ্যমে।
রাষ্ট্র ও জনগণ যেন কারো হাতে জিম্মি না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের। অন্য দিকে জনগণের কাজ সঠিক নেতৃত্ব বাছাইয়ের। এ দুইয়ের মধ্যে সুশীল সমাজের ভূমিকা অত্যধিক। সবার অংশগ্রহণে দেশে সত্যিকার অর্থে ইনসাফ কায়েম হোক। সৎ ও যোগ্য মানুষের নেতৃত্বে একটি অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থা কায়েম হোক- সেটিই কাম্য।