যেসব ব্যবসায়ীগোষ্ঠী গত ১৫ বছর ফ্যাসিবাদী সরকারের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে নির্বিচারে জনগণের অর্থ লুটপাট ও বিদেশে পাচার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন। এ জন্য ১১টি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। কিন্তু এসব টাস্কফোর্স কতটা নিরপেক্ষ তদন্ত করবে, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিচ্ছে।
বুধবার প্রকাশিত নয়া দিগন্তের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, ১১টি টাস্কফোর্সের মধ্যে ৯টিরই নেতৃত্বে আছেন আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের সদস্য অথবা সুবিধাভোগীরা। এমনকি যাদের বিরুদ্ধে বা যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত হচ্ছে খোদ সেসব গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদেরও টাস্কফোর্সের সদস্য করা হয়েছে। ‘সরিষার মধ্যেই ভূত’ থাকলে দুর্নীতির ভূত তাড়ানোর দুদকের কবিরাজি কতটা সুফল দেবে- বোঝাই যাচ্ছে।
শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থার প্রকাশিত রিপোর্টের বরাতে বলা হয়, আওয়ামী লীগ তাদের মাস্টারপ্ল্যানের অংশ হিসেবে বিভিন্ন সংস্থা থেকে বাছাই করা যেসব দলীয় কর্মীকে ২০২২ সালে দুদকের প্রথম শ্রেণীর পদে নিয়োগ দেয়, সেসব দলান্ধ কর্মকর্তাই আছেন টাস্কফোর্সের নেতৃত্বে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারবর্গ আর তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তদন্তে এবং বসুন্ধরা, বেক্সিমকো, জেমকন, ওরিয়ন, নাবিল, সিকদার, সামিটের মতো কুখ্যাত গ্রুপ ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এবং সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য টাস্কফোর্স কাজ করছে।
এর মধ্যে মাত্র দু’টি টাস্কফোর্সের বিষয়ে ইতিবাচক রিপোর্ট দিয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা।
গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট সব সময় পুরোপুরি ঠিক হবে- এমন নয়। তবে সরকার চাইলে এটিকে সূত্র হিসেবে নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বছর পূর্তির এই সময়ে এসে দেখা যাচ্ছে, আমরা কার্যত খোদ ফ্যাসিবাদী খুনি আওয়ামী সরকারের মূল হোতাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিতে পারিনি। কারণ সবারই জানা। ফ্যাসিবাদের হোতারা আত্মগোপনে বা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেও তাদের যেসব দোসর দেশের ভেতরেই আছে তাদেরও আমরা একচুল নাড়াতে পারিনি। তারা প্রশাসন থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্র শুধু বহাল তবিয়তে নয়, দোর্দণ্ড প্রতাপের সাথেই খবরদারি করছে। দুদকের টাস্কফোর্সের প্রধান ও সদস্যদের পরিচয় এর ক্ল্যাসিক দৃষ্টান্ত।
গত এক বছরে দেখা গেছে, শুরুতেই স্বৈরাচারের হোতাদের নিরাপদে সরে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে, ফ্যাসিবাদের দোসরদের রক্ষায় মহলবিশেষ তৎপর হয়েছে, প্রশাসনে তাদের অনেককেই পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। কোনো কোনো দল তাদের অনেককে গ্রহণ করেছে। বিশেষ ব্যবসায়ী গ্রুপকে সুরক্ষা দিতে কথিত স্বৈরাচারবিরোধীরা কিভাবে ওইসব গ্রুপের নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ দিচ্ছেন- সেটিও কারো নজর এড়ায়নি। সেই ধারা এখনো চলছে।
স্বৈরাচারের পতনের পর তাদের বিচার, রাষ্ট্রসংস্কার এবং সুষ্ঠু নির্বাচন- এই তিনটি গণ-আকাক্সক্ষা থেকে জাতি সরে এসেছে। এর পেছনের কারণ সেই একই। পেছন থেকে কলকাঠি নেড়েছে সেই স্বৈরাচারের দোসর, অলিগার্ক এবং ভেতরের ও বাইরের প্রভুরা।
এখন একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর হলেই সম্ভবত সব কুল রক্ষা হয়।