প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ মানুষের জীবনে অভূতপূর্ব সুবিধা এনে দিয়েছে। কিন্তু এর একটি অন্ধকার দিকও আছে। প্রযুক্তিকে অপব্যবহার করে অনেক অপরাধী মানুষের জীবনকে জটিল করে তুলছে। বিশেষ করে সাইবার অপরাধের বিস্তার সাধারণ নাগরিকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতি এবং সামাজিক মর্যাদাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে। অথচ বাড়তে থাকা এই হুমকির বিপরীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা এখনো প্রত্যাশিত মানে পৌঁছতে পারেনি।

নয়া দিগন্তের একটি প্রতিবেদনে এ বিষয়ে সাম্প্রতিক তথ্য ও বিশেষজ্ঞ মতামত তুলে ধরা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, অপরাধীরা প্রযুক্তির সাথে দ্রুত খাপখাইয়ে নিজেদের কৌশল বদলে ফেলছে। কিন্তু পুলিশের প্রতিরোধব্যবস্থা সেই গতিতে উন্নত করা যাচ্ছে না। জনবল ঘাটতি, আধুনিক প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা এবং বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের অভাব— এই তিনটি বড় দুর্বলতা সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ভঙ্গুর করে তুলছে। ফলে প্রতারণা, হ্যাকিং, ডিজিটাল হয়রানি কিংবা অনলাইন জালিয়াতির মতো অপরাধ বেড়েই চলেছে।

ইতোমধ্যে পুলিশের পক্ষ থেকে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সাইবার সাপোর্ট সেন্টারের কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। আধুনিক ল্যাব, ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এবং ২৪ ঘণ্টার রেসপন্স টিমের মাধ্যমে নাগরিকদের অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত সেবা দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নারী ও কিশোরদের অনলাইন হয়রানি প্রতিরোধেও বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এগুলো অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে বাস্তবতা হলো, এসব উদ্যোগ এখনো সীমিত পরিসরে সীমাবদ্ধ এবং দেশের বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে পর্যাপ্ত নয়। ঢাকার বাইরে সাইবার অপরাধের বিস্তার যেভাবে বাড়ছে, তাতে থানাভিত্তিক সাইবার ইউনিট গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দুর্বলতা। অনেক ক্ষেত্রে তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য বা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা পাওয়া যায় না। এতে অপরাধ দমনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ভুক্তভোগীদের মধ্য থেকেও অনীহা দেখা যায়। সামাজিক সঙ্কোচ বা অজ্ঞতার কারণে অনেকেই অভিযোগ করতে আসেন না। এই প্রবণতা সমস্যাকে আরো জটিল করে তোলে। ফলে অপরাধীরা অনেক সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। তাদের দুঃসাহস বাড়তে থাকে।

এই পরিস্থিতিতে সাইবার নিরাপত্তাকে প্রান্তিক কোনো বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত, বাস্তবসম্মত এবং দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ। সাইবার পুলিশিংকে বিকেন্দ্রীকরণ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি জেলা ও থানায় বিশেষায়িত সাইবার ইউনিট গড়ে তোলা যায়। এতে স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়ার ব্যবস্থা হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতা বাড়াতে আন্তর্জাতিক মানের টুলস ও সফটওয়্যার ব্যবহার করতে হবে। দক্ষ জনবল তৈরিতে জোর দিতে হবে। শুধুমাত্র প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নয়, ধারাবাহিক ও উন্নতমানের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এতে অপরাধীদের চেয়ে অন্তত এক ধাপ এগিয়ে থাকা যাবে।

সাইবার নিরাপত্তা কেবল পুলিশের একার দায়িত্ব নয়। এটি রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। প্রযুক্তিনির্ভর যুগে নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তুলতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। না হয় অপরাধীরা আরো শক্তিশালী হয়ে উঠবে। নাগরিক আস্থা আরো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যার মূল্য দিতে হবে পুরো সমাজকেই।