মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হয়েও বাংলাদেশ মাদকের ঝুঁকিতে রয়েছে। মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় দেশে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। লক্ষণীয়, গত শতাব্দীর আশির দশকের শুরু থেকে দেশে ভারত থেকে প্রচুর পরিমাণে ফেনসিডিল আসা শুরু হয়। পরে ফেনসিডিলের জায়গা নেয় ইয়াবা। মিয়ানমার থেকে এখনো প্রচুর ইয়াবা আসে। পাশাপাশি নতুন করে আসা শুরু হয়েছে ক্রিস্টাল মেথ, যা মূলত ইয়াবার মূল উপাদান। ভারত ও মিয়ানমার থেকে অরক্ষিত সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ও অপ্রচলিত মাদক দেশে আসছে।

দেশে মাদক পরিস্থিতি এত উদ্বেগজনক যে, তা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) সমীক্ষার প্রাক্কলিত সংখ্যা দেখে সহজে বোঝা যায়। ওই সমীক্ষায় বলা হয়েছে- দেশে এখন মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা ৮৩ লাখ। যা আমাদের মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ। এর আগে ২০১৮ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট একটি সমীক্ষা করেছিল, সেখানে মাদকাসক্তের সংখ্যা পাওয়া গিয়েছিল ৩৬ লাখ।

মাদকাসক্তের সংখ্যা যদি সত্যি ৮৩ লাখে পৌঁছে যায়, তাহলে এটি দেশের মাদক পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি নির্দেশ করে। সেই সাথে এটি প্রমাণিত হয়, মাদক একেবারে নিয়ন্ত্রণে নেই। এটিও দুশ্চিন্তার বিষয় যে, এই বিপুলসংখ্যক মাদকাসক্তকে যদি পুনর্বাসন করা না যায়, তারা সমাজের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

ডিএনসির তথ্য, মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৬১ লাখ গাঁজায় (৫২ শতাংশ), ২৩ লাখ ইয়াবায় (২০ শতাংশ) ও ২০ লাখ ২৪ হাজার মদ্যপানে (১৭ শতাংশ) আসক্ত। তিন লাখ ৪৬ হাজারের বেশি মানুষ ফেনসিডিল ও সমজাতীয় মাদকে এবং তিন লাখ ২০ হাজার মানুষ হেরোইনে আসক্ত। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে পুরুষ ৭৭ লাখ ৬০ হাজার এবং নারী দুই লাখ ৮৫ হাজার। এর বাইরে দুই লাখ ৫৫ হাজার শিশু-কিশোর মাদকে আসক্ত। সঙ্গত কারণে এখন আর মাদক বহনকারীকে ধরে লাভ নেই। ধরতে হবে হোতাদের। যাতে মাদক কারবারিদের রুখে দেয়া যায়।

দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও কোস্টগার্ড মাদক নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। তবে অভিযোগ রয়েছে, মাদকের ছোট কারবারি, বিক্রেতা ও মাদকসেবীদের বেশি ধরা হয়। আড়ালে থেকে যায় বড় মাদক কারবারিরা। আবার মাদক মামলার তদন্ত ও সাক্ষ্যদান ঠিকমতো হয় না বলে বড় অংশের মামলায় আসামি খালাস পেয়ে যান। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের হিসাবে, ২০২৪ সালে তিন হাজার ৬৯৮টি মাদক মামলার রায় হয়েছে, এর মধ্যে ৫৫ শতাংশ মামলায় সব আসামি খালাস পান।

প্রকৃত বাস্তবতায় মাদকের বিস্তারে তরুণদের একাংশের জীবন নষ্ট হয়ে যায়। পরিবারে অশান্তি বাড়ে। মাদকাসক্তরা নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তারা নানা রোগে আক্রান্ত হয়। মাদকাসক্তি ও রোগের চিকিৎসায় বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। মাদক চোরাচালানে দেশ থেকে বিপুল অর্থ পাচার হয়। তাই চিকিৎসার মাধ্যমে মাদকাসক্তদের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা জরুরি। এদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে না পারলে বিপুল মানবসম্পদ অপচয়ের মুখে পড়ব আমরা। কিন্তু সমস্যা হলো- মাদকাসক্তদের জন্য দেশে পর্যাপ্ত বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র নেই। সরকারি পর্যায়ে মাত্র ২৭৯ রোগী ভর্তি করে একসঙ্গে সেবা দেয়া যায়। আর বেসরকারি পর্যায়ে ৩৮৭টি মাদক নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে।

এ দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের আশু কর্তব্য হলো- যেকোনো উপায়ে হোক দেশে মাদকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আনা। এ জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি যেমন প্রয়োজন; ঠিক তেমনিভাবে পারিবারিক সচেতনতাও জরুরি।