ঢাকায় ফুটপাথ দখলমুক্ত করতে পুলিশ টানা ছয় দিন অভিযান চালিয়েছে। রাজধানীর আটটি ট্রাফিক জোনে মেট্রোপলিটন পুলিশ এ সাঁড়াশি উচ্ছেদ অভিযান চালায়। গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরের ফুটপাথের ৮০ শতাংশ জায়গা রেস্তোরাঁ, গ্যারেজ, আসবাবের দোকান কিংবা ওয়ার্কশপের দখলে। এদের উচ্ছেদ করে ফুটপাথ ও সড়কের অংশ দখলমুক্ত করার কাজ আগেও বহুবার দেখা গেছে; কিন্তু খুব দ্রুতই সেগুলো আবার বেদখল হয়ে গেছে। এবারের উচ্ছেদ অভিযান যেন সে রকম লোক দেখানো কিছু না হয়।

শুধু ফুটপাথ নয়, মূল সড়কের একটি অংশও হকার ও ব্যবসায়ীদের দখলে। ক্ষুদ্র ব্যবসায় এমনকি মাঝারি রকমের ব্যবসায়ও চলে ফুটপাথ দখল করে। পথচারীরা বাধ্য হন রাস্তায় হাঁটতে। এতে যান চলাচলে ব্যাঘাত ঘটে। ফুটপাথ দখল যানজটের অন্যতম কারণ। সড়ক দুর্ঘটনার জন্যও এটি প্রধানত দায়ী। এসব প্রশাসনের চোখের সামনে ঘটলেও ফুটপাথ স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত করা যায় না। একটি শ্রেণীর বিনা বিনিয়োগে অর্থ কামানোর সুযোগ এর প্রধান কারণ।

রাজধানীর ফুটপাথ থেকে প্রতি মাসে ১০০ কোটি টাকার মতো চাঁদা ওঠে। একটি দুর্বৃত্তচক্র এর নিয়ন্ত্রক। এই চক্র সবসময় ক্ষমতাসীন দলের মধ্য থেকে হয়। ক্ষমতার পরিবর্তন হলে দুর্বৃত্ত চক্রের শীর্ষ পর্যায়ে বদল হয়। যেমন ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ পালিয়ে গেলে অন্য একটি রাজনৈতিক দলের হাতে এর নিয়ন্ত্রণ আসে। এবার এই নতুন গোষ্ঠী চাঁদার ভাগিদার হয়। এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন গোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়ে। অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা গ্রহণ থেকে শুরু করে বিএনপি সরকারের ক্ষমতায় আসা পর্যন্ত এ নিয়ে খুনোখুনিতে অনেকে প্রাণ হারান। এমনকি বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের পরও ফুটপাথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজধানীতে খুনের ঘটনা ঘটেছে। ফুটপাথের পাশাপাশি ঢাকায় আরো বহু ধরনের চাঁদা ও উপরি উঠানোর ক্ষেত্র রয়েছে। ক্ষমতাসীনদের আশ্রয়ে সবমিলিয়ে হাজার কোটি টাকার অবৈধ আয়ের সুযোগ রয়েছে।

পুলিশের চালানো ফুটপাথ দখলমুক্ত করার এ অভিযানের সফলতা নিয়ে সংশয় রয়েছে। সরকার সত্যিকার অর্থে জনস্বার্থে এই অভিযান চালাচ্ছে কি না, সেটিই প্রশ্ন। আওয়ামী সরকারের সময় চাঁদাবাজি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে চাঁদার ভাগ কে কত অংশ পাবে— সেটি নির্ধারণ করে দেয়া হতো। তাই বড় ধরনের চাঁদা আদায় হলেও নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা নিয়ে একটি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর সেই সিন্ডিকেট ভেঙে পড়ায় এর আধিপত্য নিয়ে অস্থিরতায় খুনের ঘটনা ঘটেছে। বিগত কয়েক মাসে ফুটপাথ দখল-পাল্টা দখল কিংবা ব্যবসায় হাতবদলের একধরনের অস্থিরতা দেখা গেছে। এবারো ফুটপাথ অন্য কোনো গোষ্ঠীর কাছে হাতবদলের জন্য পুলিশি অভিযান চালানো হচ্ছে?

ঢাকায় প্রয়োজনের তুলনায় ফুটপাথ ও রাস্তা কম। কোটি কোটি মানুষের নড়াচড়ারও যেন সুযোগ নেই। এ অবস্থায় বিদ্যমান ফুটপাথ উন্মুক্ত রাখতে হবে, দখলমুক্ত রাখতে হবে। ফুটপাথ দখলমুক্ত করার পুলিশের এবারের অভিযানও যেন ফুটপাথ হাতবদলের একটি পুরনো খেলায় রূপ না নেয়, সেটিই রাজধানীবাসীর প্রত্যাশা।