গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির এক জরিপে উঠে এসেছে, ব্যবসায়ীদের ৭২ শতাংশ মনে করেন, কর কর্মকর্তারা ব্যাপকভাবে দুর্নীতির সাথে জড়িত। ৮২ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করেন, দেশের কর ব্যবস্থা অসঙ্গতিপূর্ণ। আর ভ্যাট ফাঁকির কারণে ক্ষতি বছরে এক লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। সিপিডির জরিপটি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ১২৩টি কোম্পানির প্রতিনিধির মধ্যে পরিচালিত হয়।
সিপিডির গবেষণা জরিপটি এমন এক সময়ে প্রকাশ হলো; যখন রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠান এনবিআর নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআরকে বিভক্ত করার সরকারি সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ব্যাপক আন্দোলন শুরু করেছিলেন। পরে ব্যবসায়ীদের মধ্যস্থতায় তারা আন্দোলন স্থগিত করেন। এর পর থেকেই এনবিআরের অনেক কর্মকর্তা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে তাদের কৃতকর্ম ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে আছেন বলে গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়। ২০২৪ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক সদস্যের ছেলের ছাগল কেনাকে কেন্দ্র করে তুলকালাম সৃষ্টি হয়। পরে এনবিআরের সেই সদস্য মতিউর রহমানের ব্যাপক দুর্নীতির খবর বেরিয়ে আসে। মতিউর রহমান এখন কারাগারে। মতিউরের মতো এনবিআরে আরো যেসব কর্মকর্তা রয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে দুদককে সরব হতে হবে।
দেশের রাজস্ব আহরণের বেশির ভাগ কাজই এনবিআর করে। কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির এমন অভিযোগ প্রতিষ্ঠানটির রাজস্ব আদায় ঋণাত্মক দিকে ধাবিত করবে বলে আমাদের আশঙ্কা। রাজস্ব আদায়ে কর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আর সেটি হতে পারে পদ্ধতিগত সংস্কারের মাধ্যমে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেছেন, ‘অটোমেশন পদ্ধতি না থাকায় অব্যবস্থাপনার অভিযোগ সবার। অটোমেশন পদ্ধতি শুরু হলেই ৪০ শতাংশ অব্যবস্থাপনা কমে যাবে।’
কর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যেমন দুর্র্নীতির অভিযোগ রয়েছে, তেমনি ব্যবসায়ীসহ অনেকের বিরুদ্ধে কর ফাঁকি দেয়ারও অভিযোগ রয়েছে। সিপিডি তার গবেষণায় বলেছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ২০২২-২৩ অর্থবছরে আদায় করেছে এক লাখ ৩২ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। তবে সে সময়ে ভ্যাট বাবদ তিন লাখ ২০ হাজার ১১৭ কোটি টাকা সরকারের কোষাগারে আসার ‘সম্ভাবনা’ ছিল। বাকি অর্থ কর ফাঁকি ও অব্যাহতির জন্য এনবিআর ‘হারিয়েছে’।
রাজস্ব ফাঁকি রোধে ক্যাশলেস পদ্ধতিতে যাওয়ার একটি আলোচনা শোনা যায় গত সরকারের শেষের দিকে। তখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বলেছিল, তারা ২০৩১ সালের মধ্যে ৭৫ শতাংশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে শতভাগ ক্যাশলেস লেনদেন সম্পন্ন করবে। এনবিআরের বর্তমান প্রশাসন ক্যাশলেস লেনদেনের দিকে যাবে কি-না আমরা জানি না।
সরকার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সংস্কারে কমিটি গঠন করেছে। আমরা আশা করি, এনবিআর সংস্কারের মাধ্যমে কর কর্মকর্তাদের দুর্নীতির পথ যেমন বন্ধ হবে, তেমনি কেউ কর ফাঁকি দেয়ারও কোনো সুযোগ পাবেন না।