দেশের প্রবীণ সংবাদিক ও নয়া দিগন্তের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক আলমগীর মহিউদ্দিন আর নেই। রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল শনিবার বেলা দেড়টায় তিনি ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। কাজের মধ্যে থাকলেও স্ত্রীর মৃত্যুর পর কার্যত গত চার বছর ধরে তিনি একরকম নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করছিলেন।
দেশবরেণ্য সাংবাদিক আলমগীর মহিউদ্দিন বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের উজ্জ্বল এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকে সাংবাদিকতার শুরু তার। তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধান প্রধান দৈনিক ও বার্তা সংস্থায় নানা পদে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। একজন খ্যাতিমান সাংবাদিক হিসেবে বিশ্বের বহু দেশ সফর করেন তিনি। সেখান থেকে রিপোর্ট করেছেন। ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নয়া দিগন্তের সাথে ছিলেন। তার হাত ধরে নয়া দিগন্তের আত্মপ্রকাশ। মাস তিনেক আগে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তির আগপর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় দুই দশক সম্পাদক হিসেবে পত্রিকাটির নেতৃত্ব দেন। গত ৩০ মে অসুস্থ হয়ে পড়লে নয়া দিগন্ত কর্তৃপক্ষ তাকে আলঙ্কারিক উপদেষ্টা সম্পাদক পদে বরণ করে সম্মান প্রদর্শন করে।
আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনে নয়া দিগন্তে সব রকম বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেয় সরকার। দীর্ঘ ১৫টি বছর নয়া দিগন্ত ধুঁকে ধুঁকে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে। কিন্তু বন্ধ হয়নি। এর পেছনে আলমগীর মহিউদ্দিনের সুনামের বড় ভূমিকা ছিল। তার নেতৃত্ব গুণে ভিন্নমতের মুখপত্র হওয়া সত্তে¡ও নয়া দিগন্ত স্বৈরাচারের কোপানলে পড়েও অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। আলমগীর মহিউদ্দিনের এ অবদান নয়া দিগন্ত সব সময় মনে রাখবে।
শুধু নয়া দিগন্ত নয়; তার অবদান দেশের সাংবাদিকতা ও রাজনীতিতেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি ছিলেন, সাংবাদিকদের শিক্ষক। সমাজ রাজনীতির নানা ঘটনাবলি এবং উত্থান-পতনের ধারাবাহিক ইতিহাস তার কাছে যেমনটা জানা যেত; তেমন আর কারো কাছে নয়। সংবাদ কক্ষের বাইরে তার সম্পৃক্ততা ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত পরামর্শ দেয়ার প্রবণতা অনেক অনুসন্ধিৎসু সাংবাদিকের কাজ সহজ করে দেয় এবং সাংবাদিকতার উঁচু মান রক্ষায় উৎসাহিত করতে অবদান রাখে। মৃত্যুর বছরখানেক আগেও তার স্মৃতি ছিল অটুট।
একজন সাংবাদিক হিসেবে সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় কণ্ঠস্বর গঠনে সহায়তা করেন তিনি। তার সম্পাদকীয় কলাম ও মতামতের মাধ্যমে শাসন, জবাবদিহি ও জননীতি সম্পর্কিত বিষয়ে অবদান রাখেন তিনি। তার মতামত পাঠক ও নীতিনির্ধারকদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিজস্ব অবস্থান তৈরিতে সহায়ক হয়। তার কর্মকাণ্ড ছিল সুশাসনের পক্ষে এবং দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান থেকে, যা ছিল সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা আনতে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আকাক্সক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একই সাথে সংবাদপত্রের সম্পাদক পরিষদের সদস্য হিসেবে বরাবর ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছেন।
সরল মনের অধিকারী ও নির্বিরোধী মানুষ আলমগীর মহিউদ্দিনের ইন্তেকালে আমরা নয়া দিগন্ত পরিবার গভীরভাবে শোকাহত। আমরা তার রূহের মাগফিরাত কামনা করি। সেই সাথে তার শোকগ্রস্ত পরিবারের প্রতি জানাই আন্তরিক সমবেদনা। তার প্রতি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে জানাই গভীর প্রদ্ধা। মহান আল্লাহ তার ভুলত্রুটি ক্ষমা করে তাকে জান্নাত নসিব করুন। আমিন।