মাদক এখন সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করেছে। শহর-নগর, গ্রাম-গঞ্জসহ দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মাদকের ভয়াল ছোবল লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী কিছু এলাকায় মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্য এতটাই বেড়েছে যে, এটি এখন এলাকাবাসীর জন্য রীতিমতো লজ্জার বিষয় হয়ে গেছে। মাদককবলিত এলাকার মানুষ ছেলেমেয়ের বিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়ছেন। তাদের ছেলেমেয়ের সাথে কেউ ছেলে বা মেয়ের বিয়ে দিতে চায় না। উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী লালমনিরহাট জেলার পাঁচটি উপজেলার পরিস্থিতি এমনই। এসব উপজেলায় দীর্ঘদিন থেকে মাদক কারবারিরা মাদকের রমরমা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। মাদক কারবারিদের মধ্যে রয়েছে স্থানীয় কিছু জনপ্রতিনিধিও। পুলিশের অভিযান ও মামলা দায়েরও এসব মাদক কারবারিকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
একটি সহযোগী দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তরের জেলা লালমনিরহাটের পাঁচটি উপজেলাই সীমান্তবর্তী। ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা এসব এলাকায় চোরাচালান ও মাদকের পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এসব গ্রামে আত্মীয়তা করতেও ভয় পাচ্ছে মানুষ। গাঁয়ের বদনামে ভেঙে যাচ্ছে বহু ছেলেমেয়ের বিয়ে। সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোয় মাদক কারবারিরা এখন শুধু ব্যবসায় করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না; বরং প্রশাসনের মাদকবিরোধী অভিযান স্তব্ধ করতে শুরু করেছে প্রোপাগান্ডা। শতাধিক তালিকাভুক্ত মাদক কারবারির দাপটে হিমশিম খাচ্ছে থানা পুলিশ। বড় ডিলারদের নেটওয়ার্ক ভাঙতে গিয়ে উলটো তাদের আইনি হয়রানির অপচেষ্টার মুখে পড়ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের পরও মাদক পাচার বন্ধ না হওয়ার পেছনে রয়েছে এই শক্তিশালী চক্রের নিত্যনতুন কৌশল।
চোরাচালান ও মাদকের কারবার সীমান্তবর্তী অঞ্চলের অভিন্ন সমস্যা। এ সমস্যা যেমন বাংলাদেশে বিদ্যমান তেমনি এশিয়ার অন্যান্য দেশেও। কিন্তু তা নিয়ন্ত্রণের জন্য সীমান্তরক্ষী বা পুলিশ বাহিনীর জোরালো ভূমিকা নেই বলেই অনেকে মনে করেন।
প্রভাবশালী ও জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রশাসনে এক ধরনের শৈথিল্য দেখা যায়। এর অবসান হতে হবে। অপরাধী যেই হোক তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। শুধু আইন দিয়ে মাদক নির্র্র্মূল করা যে সম্ভব নয় তা প্রমাণিত। লালমনিরহাটে একেকজন মাদক কারবারির বিরুদ্ধে ডজনের অধিক মামলা, তার পরও তারা মাদক কারবার ছাড়েনি। এ বিষয়ে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, এসব অপরাধে জড়িয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ- শিক্ষার অভাব, বেকারত্ব ও নৈতিক মূল্যবোধ সঙ্কটের মতো বিষয়গুলো। সেই সাথে পরিবারের সচেতনতার অভাবও এসব অপরাধে জড়িয়ে যাওয়ার কারণ হতে পারে। মানুষকে শিক্ষিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু এক্ষেত্রে গ্রামাঞ্চল অনেকটাই উপেক্ষিত। ফলে অশিক্ষিত ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ে।
সীমান্তবর্তী এলাকার চোরাকারবারি ও মাদক কারবারিদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের বিষয়ে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এনজিওগুলো এসব মাদকাসক্ত ও মাদক ব্যবসায় জড়িত ব্যক্তিদের নিরাপদ এবং বৈধ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মাদকের বিরুদ্ধে দেশের আলেমসমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ জাগিয়ে।
চোরাচালান ও মাদক সমস্যার সমাধানে প্রশাসন ও এলাকার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের এখনই উদ্যোগী হওয়া দরকার।