আমন মৌসুমে দেশের বহু জেলায় সার সঙ্কট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) উৎপাদিত টিএসপি সার মিলছে না প্রয়োজনমতো। ডিএপি ও এমওপি সারেরও সঙ্কট রয়েছে। সার সঙ্কট নিরসন না হলে আমন উৎপাদন কমার আশঙ্কা রয়েছে, যার প্রভাব দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তায় পড়তে পারে। নয়া দিগন্তসহ একাধিক পত্রিকার প্রতিবেদন থেকে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
এমনিতে বন্যায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমন উৎপাদন কম হয়েছে, যার প্রভাব বাজারে পড়েছে। এতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতির ৫১ শতাংশ চালের কারণে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সারের অপ্রতুলতা দেখা দিলে স্বাভাবিকভাবে আমন উৎপাদন কমে যাবে। তখন আমদানি বাড়িয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে গেলে ডলার বা রিজার্ভের ওপর চাপ পড়বে। অর্থাৎ সার সঙ্কট দীর্ঘ হলে এর প্রভাব শুধু খাদ্যে নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়বে।
গণমাধ্যমের খবর- ব্যবসায়ী-ডিলাররা সারের কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করেছেন বলে কৃষকদের অভিযোগ। কৃত্রিম সঙ্কটে সারের দাম কেজিতে পাঁচ-ছয় টাকা বেড়েছে। কোথাও বস্তাপ্রতি ১০০-১৫০ টাকা বেশি দামে সার বিক্রি হচ্ছে। তবে অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করে ডিলাররা বলছেন, যে পরিমাণ সার তাদের বরাদ্দ দেয়া হয়; এর তুলনায় কয়েকগুণ চাহিদা রয়েছে। আমনের সময় চাহিদা বেশি হওয়ায় সার সঙ্কট আরো বেড়েছে।
দেশে সারের বার্ষিক চাহিদা ৬০ লাখ টন। যার মধ্যে ইউরিয়া ২৭ লাখ টন (তুলনামূলক স্থিতিশীল) এবং নন-ইউরিয়া : টিএসপি, ডিএপি, এমওপি (সবচেয়ে বেশি সঙ্কট)। বর্তমানে সারের সরকারি মজুদ রয়েছে ৮ দশমিক ১৯ লাখ টন (গত বছর ছিল ১১ লাখ টন)। সরকার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, ইউরিয়া ও টিএসপি সার কৃষকপর্যায়ে প্রতি কেজি ২৭ টাকা, এমওপি ২০ ও ডিএপি সার প্রতি কেজি ২১ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। অন্য দিকে, জমির উর্বরতা, মাটির ধরন ও ফসলের জাতের ওপর নির্ভর করে প্রতি একর জমিতে ইউরিয়া ১৩০-১৪০ কেজি, টিএসপি ৫০-৬০ ও এমওপি ৪০-৫০ কেজি প্রয়োজন হতে পারে।
সার সঙ্কটের কারণ আমদানিতে বিলম্ব ও অস্বচ্ছতা। বাড়তি দামে ক্রয়, মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব, নীতিগত জটিলতা ও প্রতিযোগিতাহীন আমদানির অনুমোদন। সিন্ডিকেটের বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত ডিলার নেটওয়ার্কের কারসাজি। তবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের দাবি- দেশে সারের ঘাটতি নেই। অথচ সরকার নির্ধারিত ৫০ কেজি ডিএপি সারের মূল্য এক হাজার ৫০ টাকা। বাজারে বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৪০০ থেকে ৭০০ টাকা। সরকার বলছে, নভেম্বর পর্যন্ত সমস্যা হবে না, কিন্তু বাস্তবে স্থানীয়পর্যায়ে সঙ্কট ও অতিরিক্ত দামে বিক্রি প্রমাণ করছে, বাজারে কারসাজি হচ্ছে।
নভেম্বর-মার্চ সারের পিক সিজন। এর মধ্যে সঙ্কট সমাধান না হলে কৃষি উৎপাদনব্যয় বাড়বে, ধানসহ খাদ্যশস্যের দামও বাড়বে। এতে কৃষক-ভোক্তা উভয় ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাই সার সঙ্কট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক দর প্রতিযোগিতার মাধ্যমে স্বচ্ছ আমদানি; ডিলারশিপে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তি; স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের নজরদারি ও বেসরকারি খাতে খোলা প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।