রাজধানী ঢাকায় যানজটের কারণে প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। বছরে এ ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া জ্বালানি অপচয়ে ক্ষতি হচ্ছে আরো ১১ হাজার কোটি টাকার। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি এক আলোচনা সভায় এ তথ্য জানিয়েছে।
ধারণক্ষমতার চেয়ে অধিক জনসংখ্যা শহরে নানা সমস্যার সৃষ্টি করে। ঢাকার মাত্রাতিরিক্ত যানজট এমনই অধিক জনসংখ্যা থেকে উদ্ভূত একটি সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানে রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা শুরু থেকে উপেক্ষা করেছেন। ফলে রাজধানীর যানজট সমস্যা দিনে দিনে জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে।
এখন ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থা এতটাই নাজুক যে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থেকে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এর ওপর মেয়াদোত্তীর্ণ লক্কড়ঝক্কড় মানুষের চলাচলের জন্য অনুপযোগী যানবাহন। বাধ্য হয়ে এসব বাসে যাতায়াত করেন ঢাকাবাসী। আর যাদের সামর্থ্য রয়েছে তারা নিজস্ব গাড়ি কিনে চলাফেরা করেন। গণপরিবহনের তুলনায় ব্যক্তিগত গাড়ি ঢাকার সড়কে জট সৃষ্টির অন্যতম কারণ।
গত বছরে বুয়েটের দু’জন অধ্যাপক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে দেখা করে ঢাকার যানজট নিরসনে গণপরিবহনগুলোকে একটি কোম্পানির অধীনে আনার পরামর্শ দিয়েছিলেন। চলতি বছরের আগস্ট মাসেও প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব বলেছেন, ঢাকার বাসগুলো শিগগিরই একক ব্যবস্থায় চলবে। নতুন ব্যবস্থা চালু হলে আশা করা যায় ঢাকার লাখ লাখ মানুষের জন্য যাত্রা হবে সহজ।
রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থা মান্ধাতার আমলের। কিছু সময়ের জন্য ডিজিটাল পদ্ধতি চালু হলেও তা যেন বেশি দিন টেকে না। আবারো সেই পুরনো আমলের হাত তুলে ট্রাফিক পুলিশ যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে। দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থা রাজধানীর যানজট বাড়ার অন্যতম কারণ।
ঢাকা শহরে যেখানে সেখানে গাড়ি পার্কিং করা হয়। নিয়ম-কানুন মানার কোনো বালাই নেই। অবৈধ পার্কিং বন্ধে ট্রাফিক পুলিশের কড়া ব্যবস্থা নেই। শুধু জরিমানা করেও ভালো ব্যবস্থা গড়ে তোরা সম্ভব নয়। এর জন্য পুলিশ-প্রশাসন, অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি ব্যক্তিদের সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন। গড়ে তুলতে হবে পার্কিং জোন। ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগকে পার্কিং জোন তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা দরকার। রাজধানীর ফুটপাথের একটি বড় অংশ হকারদের দখলে। হকারদের প্রতি অনেকের সহানুভূতি থাকলেও দোকানগুলো যে যানজটের কারণ হচ্ছে সেটিও মাথায় রাখা দরকার।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত যানজট শিশুদের বুদ্ধিমত্তা বিকাশ ও স্নায়বিক ক্ষতির অন্যতম কারণ। পাশাপাশি দীর্ঘ যানজটে আটকে থাকার কারণে কেবল আর্থিক ক্ষতিই নয়, মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট, কিডনি ও ফুসফুসজনিত জটিলতা বাড়ছে।
কিছু মানুষ অনেকটা বাধ্য হয়ে ঢাকা শহরে বাস করে। ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণ এ সমস্যার একটি সমাধান হতে পারে। রাজধানীতে জনসংখ্যার চাপ যেমন কমবে তেমনি মানুষের ভোগান্তিও দূর হবে। আমাদের প্রত্যাশা, সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মানুষের ভোগান্তি লাঘবে যানজট নিরসনে দ্রুত বাস্তবসম্মত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।