শেখ হাসিনার স্বৈরাচার হয়ে ওঠার অন্যতম মাধ্যম ছিল দেশের প্রহসনের নির্বাচন। একটি নয়, দু’টি নয়- পরপর তিনটি প্রহসনের জাতীয় সংসদ নির্বাচন করেছিলেন শেখ হাসিনা। দেশ-বিদেশের সব মানুষের আহ্বান-অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে তিনি এসব নির্বাচন করে দেশকে অশান্তির এক নরকে পরিণত করেছিলেন। আর নির্বাচনগুলোতে তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছিলেন তারই অনুগত রাষ্ট্রের ন্যায়-নীতিহীন সাবেক কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। বিএনপি তাদের বিরুদ্ধে মামলা করলে সম্প্রতি দুই প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে (সিইসি) গ্রেফতার করে পুলিশ।

রাতের ভোটের কারিগর সিইসি নুরুল হুদাকে গ্রেফতারের পর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন। এতে তিনি ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে রাতের ভোটের কথা স্বীকার করেছেন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। একই রকম কথা বলেছেন ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচনের সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল। গ্রেফতারের পর আদালতে উঠানো হলে তিনি বলেছেন, আমি স্বীকার করেছি, ডামি নির্বাচন করেছি।

বাংলাদেশের মানুষ শান্তিপ্রিয়, গণতন্ত্রমনা, কলহ-বিবাদ অপছন্দ করেন। ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিকে আপন করে নিয়ে ভালোবেসে ক্ষমতায় বসান। সহযোগিতা করেন মন থেকে। আর তাই স্থানীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে জাতীয় নির্বাচন- এমনকি নানা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধি বাছাই বাংলাদেশের একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হয়।

স্বাধীনতার পরপর শেখ মুজিবের সময় ভোটে কারচুপি, অনিয়মসহ অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সেগুলোর একটি সীমারেখা ছিল। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই সময়ে স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে যা হয়েছে তা দেশের অতীতের অনিয়ম আর অগণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতায় বসার চেষ্টার সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।

এতে তিলে তিলে গড়ে ওঠা নির্বাচনী সংস্কৃতি সমুদয় ধ্বংস হয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধি বাছাইয়ের বদলে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। ভোটাধিকার হরণ করে জোরজবরদস্তি নীতি চাপিয়ে দেয়ায় শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষ যারপরনাই শুধু ক্ষুব্ধ হন। সারা দেশ অগ্নিগর্ভ হয়; ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ থেকে ফ্যাসিবাদ উৎখাত হয়।

এই যে একের পর এক প্রহসনের নির্বাচনে নেতৃত্ব দিয়ে শেখ হাসিনাকে রাষ্ট্রক্ষমতায় স্বৈরশাসক হিসেবে অধিষ্ঠিত করে রাখা, তার দায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ যারা এর সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন তারা কখনো এড়াতে পারেন না। আজকে খুব অবাক লাগে, যখন এসব সাবেক সিইসি বলেন, প্রহসনের নির্বাচন করা থেকে বিরত থাকতে তাদের কিছুই করার ছিল না। কিন্তু বাস্তবে কি তাই? কখনোই না। তারা চাইলেই এই জাতীয় অন্যায় থেকে বিরত থাকতে পারতেন। কিন্তু তারা তা করেননি; বরং তারা ক্ষমতার কাছে মাথানত করে ক্ষমতা উপভোগে মত্ত ছিলেন। এসব ভুয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে তারা অবাধ সুষ্ঠু হয়েছে বলে মিথ্যাচার করে জাতির সাথে তামাশা করেছেন। দেশে এমন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অগণিত মানুষকে নানা ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। অসংখ্য মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে।

সিইসিদের এই অপরাধ সাধারণ কোনো অপরাধ নয়। তারা শপথ ভঙ্গ করেছেন। এই অপরাধ করেছেন তারা ১৮ কোটি মানুষের বিরুদ্ধে। আমরা আশা করি, সাবেক সিইসিসহ যারা প্রহসনের নির্বাচনের সাথে জড়িত তাদের সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হোক।