দীর্ঘ নির্যাতন, নিপীড়ন, অধিকারহরণ, অব্যবস্থাপনা ও বিশৃঙ্খলার পর মানুষের আশা- দেশে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা শুরু হবে। সেই ক্ষেত্র প্রস্তুতে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

এই সরকারের গণতন্ত্রের পথ উন্মোচনের পক্ষে প্রথম পদক্ষেপ উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন। ডাকসু নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তুমুল আগ্রহের সৃষ্টি হয়। এতে দেশে ফেব্রুয়ারিতে নির্ধারিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বচ্ছ হওয়ার আশা জাগিয়েছে। তার সাথে আশঙ্কার জন্ম দিচ্ছে, নির্বাচন বিতর্কিত করার অন্তর্ঘাতমূলক চেষ্টা। এবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-জাকসু নির্বাচনে দেখা গেল, আগ্রাসী হয়ে নির্বাচন ভণ্ডুলের চেষ্টা। কোনো ধরনের তথ্যপ্রমাণ ছাড়া অভিযোগ তুলে নির্বাচন বাতিলের অন্যায্য দাবি জানানো হয়। জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র প্রতিনিধি বাছাই মামুলি একটি ব্যাপার। তাই এভাবে ছাত্র সংসদ নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করা হলে তা আগামী জাতীয় নির্বাচনের জন্য একটি অশনি সঙ্কেত।

সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে ডাকসু নির্বাচন বিতর্কিত করার অপচেষ্টা হালে পানি পায়নি। জাকসু নির্বাচনে তার ধারাবাহিকতা দেখা গেল আরো বিস্তৃত পরিসরে। ব্যালট বাক্স ও সিসিটিভি সংস্থাপনকারী প্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বাক্সের ভেতর আগে ব্যালট ঢোকানো হয়েছে, সিসিটিভি বন্ধ করে জাল ভোট দেয়া হচ্ছে- এ ধরনের কোনো অভিযোগ নয়। আঙুলে দেয়া অমোচনীয় কালির মান নেই, মেঝেতে ব্যালট পাওয়া গেছে, প্রার্থীকে কেন্দ্রে ঢুকতে দেয়া হয়নি- এসব অভিযোগ এনে ছাত্রদল বিকেল ৪টায় প্রায় সম্পন্ন হয়ে যাওয়ার পর নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। ছাত্রদলের সাথে সুর মিলিয়ে আরো চারটি প্যানেল নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর ভোট বর্জন করে। তাদের কাছেও কোনো বিশ্বাসযোগ্য গুরুতর অভিযোগ ছিল না। এমনকি তারা সাংবাদিকদের সামনে সুনির্দিষ্ট করে অভিযোগ জানাতেও পারেননি। আরো আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনজন শিক্ষকের ভোট গ্রহণের একবারে শেষ সময়ে এসে নির্বাচনী কার্যক্রম থেকে সরে দাঁড়ানো। যেখানে তারা ছাত্রদের ভোট বর্জনের সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকার উপদেশ দেবেন, সেখানে ঘটল উল্টো। শিক্ষকরা যখন এভাবে লেজুড়বৃত্তিতে যুক্ত হয়ে যান, তা অত্যন্ত হতাশাজনক।

প্যানেলগুলোর ভোট বর্জন ভোটারদের ওপর তেমন প্রভাব ফেলেনি। জাকসুতে ছাত্রদের দীর্ঘ লাইন ধরে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট দিতে দেখা গেছে। কিছু কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিত থাকায় নির্ধারিত সময়ের পরও ছাত্ররা ভোট দেন। ৬৮ শতাংশ ভোটার এবার জাকসুতে ভোট দিয়েছেন। ভোট বর্জনকে এসব ছাত্র ভালোভাবে নেননি। মিডিয়ায় তারা তাদের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।

ডাকসুতে দেখা গেছে, যারা জিততে পারেননি তারা নির্বাচন সুষ্ঠু না হওয়ার অভিযোগ তোলেন। আমি জিতলে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে- এমন সুবিধাবাদী মানসিকতা থেকে সরে আসতে হবে আমাদের। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতি চর্চা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, ব্যবস্থাকে বিতর্কিত করে কোনো ফায়দা নেই। আজ যারা জিততে পরেননি ভবিষ্যতে তাদের জিতলে হলে সুস্থ সংস্কৃতির প্রয়োজন। তা না হলে আজ যারা হেরে গেছেন আগামীতে তারা যখন জিতবেন, তাদের বিরুদ্ধে একই ধরনের ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা হবে। গণতন্ত্রের অন্যতম সৌন্দর্য পরাজয় বরণ করে নেয়ার মানসিকতা।