দেশের অর্থনীতিতে টানাপড়েন বাড়ছে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। গত ১৫ বছরে দেশে চোরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে যে নির্বিচার লুটপাট চালানো হয়েছে, বর্তমান সঙ্কট তারই অনিবার্য পরিণতি। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ তখনই বলেছিলেন, আওয়ামী লীগের ধ্বংস করে যাওয়া অর্থনীতি মেরামত করা পরের কোনো সরকারের পক্ষে অসম্ভব হতে পারে। এখন সেই পরিস্থিতিই দেখা যাচ্ছে। তবে এখনো যে হাহাকারের সৃষ্টি হয়নি সেখানেই অন্তর্বর্তী সরকারের কৃতিত্ব। বাজারে পণ্যমূল্য মোটামুটি স্থিতিশীল আছে। হাসিনা সরকারের অবিবেচনাপ্রসূত বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা হচ্ছে। তার পরও হাসিনার শেষ সময়ের ২০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে যাওয়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ২৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এই পরিমাণ অর্থ দিয়ে দেশের তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। তবে এতেও স্বস্তির কারণ নেই। বর্তমান সঙ্কট সহসা মিটে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, দাতা দেশ ও সহযোগী সংস্থাগুলো সরকারকে তেমন সহযোগিতা করছে না।
নয়া দিগন্তের এক রিপোর্টে জানা যাচ্ছে, উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতিশ্রুতির প্রায় ৯১৬ কোটি ডলার পাইপলাইনে রয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, প্রতিশ্রুতির পরিমাণ যেমন কমেছে, তেমনি কমেছে অর্থ ছাড়ের পরিমাণও।
চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে ছাড় হয়েছে ৫৬০ কোটি ৮১ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছাড় হয়েছিল ৭০২ কোটি পাঁচ লাখ ৫০ হাজার ডলার। আর আগের অর্থবছরের তুলনায় এ বছর উন্নয়ন সহযোগীরা নতুন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যথেষ্ট কম।
আইএমএফ যদিও সম্প্রতি তার আগের প্রতিশ্রুত ঋণের কিস্তি দিয়েছে। এডিবির ছাড়ের পরিমাণও সন্তোষজনক কিন্তু বিশ্বব্যাংকসহ অন্যদের সাড়া ইতিবাচক নয়। ভারত, চীন ও রাশিয়া নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। এই তিন দেশ তাদের আগের দেয়া প্রতিশ্রুতির কিছু অর্থ ছাড় করেছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য। ভারত ১৬ কোটি ৩১ লাখ ৯০ হাজার ডলার, চীন ৪১ কোটি ৪৭ লাখ ডলার, রাশিয়া ৬৭ কোটি ৪৯ লাখ ৩০ হাজার ডলার ছাড় করেছে।
এই গাছাড়া ভাব নিছক কোনো সাধারণ ঘটনা মনে করার কারণ নেই। এর পেছনে দেশী-বিদেশী প্রভাব থাকার সম্ভাবনা শতভাগ।
সাম্প্রতিক পাক-ভারত যুদ্ধের উত্তেজনা চলার সময় আইএমএফ পাকিস্তানকে বিপুল অঙ্কের ঋণ ছাড় করে। এ নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রচারণায় স্পষ্ট হয় যে, পাকিস্তানকে ঋণ দেয়া বন্ধ করতে ভারত সব ধরনের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিল। সেই একই লবি বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও সক্রিয় নয়, এমন ভাবার কারণ নেই।
যাই হোক, আন্তর্জাতিক দাতাদের এই মনোভাব বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিশ্চিতভাবেই প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে দ্রুত নির্বাচন চাওয়া দল ও গোষ্ঠীগুলোর দাবির বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের মনোভাব নমনীয় করতে এটি অনুঘটক হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে বলে অনেক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষক মনে করছেন।
নির্বাচন একটি দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার জন্য অবশ্যম্ভাবী। এটি জরুরি। কিন্তু সংস্কারবিহীন নির্বাচন যে গণতন্ত্রের গ্যারান্টি নয় সেটি ভুললে চলবে না।