দীর্ঘসূত্রতা বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার অন্যতম বড় সঙ্কট। সাধারণ মামলা থেকে শুরু করে চাঞ্চল্যকর মালমাগুলো পর্যন্ত নিষ্পত্তি করতে দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে। আবার এর মধ্যে দুর্বল তদন্তের কারণে অনেক মামলার আসামি খালাস পেয়ে যাচ্ছে। বিচার পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা এক দিকে যেমন বিচারপ্রার্থীদের হতাশ করছে, তেমনি অপরাধীদেরও অপরাধ করতে উৎসাহ জোগাচ্ছে।

গত বুধবার নয়া দিগন্তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০ বছরের পিবিআইয়ের অনুসন্ধান-সংক্রান্ত এক সমীক্ষা মতে, প্রায় ৫২ শতাংশ হত্যা মামলাই প্রমাণ করা যাচ্ছে না। ফলে অধিকাংশ আসামিই আদালতে খালাস পেয়ে যাচ্ছে। দেশে প্রতি বছর সাড়ে চার হাজারের বেশি হত্যা মামলা হলেও তার বড় অংশই প্রমাণের অভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। বছরের পর বছর তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে অনেক আসামি বেকসুর খালাস পেয়ে যায়।

গবেষণায় দেখা যায়, মোট মামলার প্রায় ৫১.৬৮ শতাংশই প্রমাণ করা যায় না। এর মধ্যে ৩৮.২ শতাংশ মামলা বাদি ও বিবাদির আপসে এবং ১১.৪ শতাংশ মামলা তদন্ত ত্রুটির কারণে খালাসে গড়ায়। হত্যা মামলায় সাজার হার কম হওয়ার পেছনে মূলত এসব কারণ রয়েছে। যেসব মামলায় সাজা হয়েছে, তার মধ্যে ২৬.১ শতাংশ মৃত্যুদণ্ড, ৪১.৭ শতাংশ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৩২.২ শতাংশ সাধারণ সাজা।

সাংবাদিক সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ডের প্রায় ১৩ বছর পার হলেও খুনিদের এখনো শনাক্ত করা যায়নি। এখন ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার ওপর চালানো গণহত্যার মামলাগুলো নিয়ে নতুন সঙ্কট তৈরি হয়েছে। এক জেলার মামলার আসামি অন্য জেলায় অবস্থান করায় আসামি, সাক্ষী ও বাদিরা পড়ছেন চরম ভোগান্তিতে। অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষী পাওয়া যাচ্ছে না, কোথাও আবার বাদি ও বিবাদির আপসে মামলা দুর্বল হয়ে পড়ছে।

যেকোনো হত্যাকাণ্ডের পর তার আলামত জব্দ কিংবা মামলার তদন্তের ভার পুলিশের বিশেষ শাখার ওপর ন্যস্ত থাকে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পুলিশ বিভাগের দায়িত্ব বেশি। কিন্তু পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের যে অভিযোগ, তার মধ্য দিয়ে পুলিশ কি অপরাধীদের বাঁচাতে সহযোগী হয় কি না, খতিয়ে দেখা দরকার। এ বিষয়ে পুলিশের উচ্চপর্যায়ের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।

আদালতে বিচারক সঙ্কটের কারণে মামলার শুনানির ক্ষেত্রে এক ধরনের জটিল পরিস্থিতি কাজ করে। এ অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলেও বিচার বিভাগের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কোনো প্রকার কর্ণপাত করেন বলে মনে হয় না। এখন বিচার বিভাগ স্বাধীন। একই সাথে বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয়ও হয়েছে। এখন আদালতের বিচারক সঙ্কট দূর করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া দরকার।

জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলাগুলো বিচারের ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থা থাকার কথা ছিল। কিন্তু সরকারের সে দিকে খেয়াল আছে বলে মনে হয় না। বলা হয়- জাস্টিজ ডিলেইড ইজ জাস্টিজ ডিনাইড। প্রত্যাশিত সময়ের মধ্যে ন্যায়বিচার না পেলে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বৃদ্ধি পায়। তখন আইন হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা বাড়তে থাকে। বিচার প্রশাসনকে এই দুর্বলতা মাথায় নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।