গত সোমবার প্রকাশ হয়েছে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল। গড়ে পাস করেছে মাত্র ৬২.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। ২০০৭ সালের পর গত ১৯ বছরে এই পাসের হার সর্বনিম্ন। এবার বেশির ভাগ শিক্ষার্থী ফেল করেছে ইংরেজি ও গণিতে। ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬.২০ শতাংশ। জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২২ হাজারের বেশি। শুধু তা-ই নয়, তিন শ’র বেশি প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি।

এই ফলাফলকে বড় বিপর্যয় বলে মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, এই পতন হঠাৎ নয়; শিক্ষাব্যবস্থার জরাজীর্ণ চেহারাই এবার প্রকাশ হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন তা ঢেকে রাখা হয়েছিল। এবার খাতা মূল্যায়ন করা হয়েছে কঠোরভাবে, অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা যেমন লিখেছে, নম্বরও পেয়েছে তেমন। এর আগের বছরগুলোতে পাসের হার বাড়ানোর প্রতিযোগিতা ছিল। কৃত্রিমভাবে তৈরি করে দেয়া হতো ভালো ফলাফল। কিন্তু এবার সেটি হয়নি। ফলাফল প্রকাশের পর শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, ‘মন খুলে গান গাওয়া যায়, নম্বর দেওয়া যায় না।’

এই নীতির কারণেই এবার আমরা নির্মম সত্যের মুখোমুখি হয়েছি। মন খুলে নম্বর না দেয়ার নীতি প্রশংসনীয়। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়, শিক্ষার্থীরা কেন শিখতে পারল না? শ্রেণিকক্ষে পড়ালেখায় ঘাটতি ছিল? প্রশাসনিক তদারকিতে দুর্বলতা ছিল?

এবারের ফলাফলে উদ্বেগজনক দিক হলো মানবিক বিভাগে বিপর্যয়। মানবিক বিভাগ থেকে পরীক্ষা দেয়া ১০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৫১ জন ফেল করেছে। এর পাশাপাশি মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলও হতাশাজনক। দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী মানবিকে পড়াশোনা করে। এই ধস তাদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অন্যদিকে গণিত ও ইংরেজিতে দুর্বলতা আমাদের দেশে নতুন নয়। বছরের পর বছর এই দুই বিষয় শিক্ষার্থীদের জন্য আতঙ্কের কারণ। এটি শিক্ষা প্রশাসনের ব্যর্থতাই নির্দেশ করে। তাছাড়া কারিগরি শিক্ষায় সরঞ্জাম ও দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতি আছে।

তবে সামগ্রিক অবনতির মধ্যেও আশা জাগিয়েছে নারী শিক্ষার্থীরা। পাসের হার ও জিপিএ ৫ প্রাপ্তি- দুই সূচকেই ছাত্রদের চেয়ে বড় ব্যবধানে এগিয়ে আছে ছাত্রীরা। মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাতেও মেয়েদের অগ্রযাত্রা ইতিবাচক বার্তা দেয়। তবে ছাত্রদের পিছিয়ে পড়ার কারণ খতিয়ে দেখা জরুরি।

এখন মূল গলদগুলো দূর করার সময়। ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতা কাটাতে বিদ্যালয়গুলোতে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের নিবিড় শিক্ষাদান কর্মসূচি চালু করতে হবে। এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যেন শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে না পড়ে। মানবিক বিভাগের পাঠ্যক্রম ও পাঠদান পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। কারিগরি শিক্ষায় প্রয়োজনীয় ল্যাব, যন্ত্রপাতি ও মানসম্পন্ন প্রশিক্ষক নিয়োগ দেয়া জরুরি। যেসব প্রতিষ্ঠানে পাসের হার শূন্য, সেগুলোতে পড়াশোনার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। যেসব কারণে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা থেকে বিচ্যুত হচ্ছে, সেগুলো মোকাবেলায় অভিভাবক ও শিক্ষকদের সচেতন অংশীদারত্ব বাড়াতে হবে।

শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা না গেলে এই সনদ অর্জনের চূড়ান্ত মূল্য সামান্যই থেকে যাবে।