মাহামুদুল হক
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন সংসদে গত ৮ জুলাই জানান, সরকার ১৯৭৪ সালের প্রেস কাউন্সিল আইন সংশোধন করে বার কাউন্সিলের মতো ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের মাধ্যমে সাংবাদিক নিবন্ধনের ব্যবস্থা করবে। এছাড়া মিথ্যা, হয়রানিমূলক ও নৈতিকতাবিরোধী সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে আর্থিক জরিমানার বিধানও আইনে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কারণ, আইনের অপপ্রয়োগের মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

যুক্তরাজ্য, জার্মানি, কানাডা, নরওয়ে, সুইডেন ও অস্ট্রেলিয়াসহ অধিকাংশ উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে সাংবাদিক হওয়ার জন্য সরকারের নিবন্ধন, বাধ্যতামূলক প্রেসকার্ড বা অনুমতির প্রয়োজন হয় না। কেননা, সাংবাদিক নিবন্ধন ও শিক্ষাগত যোগ্যতা অন্তর্ভুক্তির এমন আইন সাংবাদিকতার স্বাধীনতা সঙ্কুচিত করতে পারে। জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কমিটির General Comment No. 34 (2011)-এ বলা হয়েছে, ‘সাংবাদিকতা কেবল পেশাদার সাংবাদিকদের কাজ নয়; ব্লগার ও অন্যান্য তথ্য প্রকাশকারীরাও এর অংশ। তবে নির্দিষ্ট স্থান বা অনুষ্ঠানে প্রবেশের জন্য সীমিত অ্যাক্রেডিটেশনের ব্যবস্থা থাকতে পারে।’

আন্তর্জাতিকভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করে আর্টিকেল নাইনটিন। সংস্থাটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের আলোকে সাংবাদিকদের বাধ্যতামূলক লাইসেন্স বা নিবন্ধনপ্রক্রিয়া গ্রহণযোগ্য মনে করে না। ইউনেস্কো, ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টস, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস, রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসসহ সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠনও বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিক নিবন্ধনের বাধ্যতামূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

চীন সরকার ১০ জানুয়ারি ২০০৫ সাল থেকে সব সাংবাদিকের জন্য প্রেসকার্ড ধারণ বাধ্যতামূলক করে। এই কার্ড পেতে সাংবাদিকদের সরকার নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে, ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং ‘পেশাগত নৈতিকতা’ মেনে চলার শর্ত। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিশেষজ্ঞরা এ ধরনের বাধ্যতামূলক সাংবাদিক নিবন্ধন ব্যবস্থার বিরোধিতা করেছেন।

তবে বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। সাংবাদিক নিবন্ধনের ধারণা পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়া যায় না। কারণ, বাংলাদেশে সাংবাদিকতা বর্তমানে দ্বৈত সঙ্কটের মুখোমুখি। একদিকে রয়েছে ভুঁইফোড় সাংবাদিক, নামসর্বস্ব সংবাদপত্র ও অনলাইন পোর্টাল, পরিচয়পত্রনির্ভর চাঁদাবাজি এবং অপেশাদার আচরণের অসংখ্য অভিযোগ; অন্যদিকে আছে নিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতার আশঙ্কা। তথ্যমন্ত্রীর দেয়া তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশে তিন হাজার ৩৩৮টি পত্রিকা রয়েছে। এর বাইরে আছে কয়েক হাজার অনলাইন মাধ্যম। সংখ্যায় গণমাধ্যম ঘন হয়েছে বটে, কিন্তু মানসম্মত গণমাধ্যম এখনো ধরাছোঁযার বাইরে। হাতেগোনা এক দু’টি প্রতিষ্ঠান মানসম্মত সাংবাদিকতা করে।

Pen

সাংবাদিক পরিচয়ে অনিয়ম, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের ঘটনা নতুন নয়। অসংখ্য সংবাদপত্র ও অনলাইন মাধ্যম রয়েছে, যাদের কার্যত কোনো নিয়মিত প্রকাশনা নেই, পাঠক নেই, প্রভাব নেই; আছে শুধু পরিচয়পত্র। সেই পরিচয়পত্র ব্যবহার করে সরকারি দফতর, ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ নেয় একশ্রেণীর সাংবাদিক নামধারী সুযোগসন্ধানী। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রকৃত সাংবাদিকরা, বাধাগ্রস্ত হয় সৎ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা। সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়।

ফলে সাংবাদিক নিবন্ধনপ্রক্রিয়ায় বাস্তবতা, গণতন্ত্র এবং পেশাগত মান, এই তিনটির মধ্যে সুসংহত ভারসাম্য প্রয়োজন। সংবাদমাধ্যমকে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। রাষ্ট্রের আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম স্বাধীন সাংবাদিকতা। তাই নিবন্ধনের লক্ষ্য হওয়া উচিত সাংবাদিকতার পেশাগত মান নিশ্চিত করা, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা নয়।

স্বাধীন সাংবাদিকতা খর্ব না করেও সাংবাদিক নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা সম্ভব। স্বচ্ছ, পরীক্ষাভিত্তিক, মেধানির্ভর এবং নৈতিকতাকেন্দ্রিক নিবন্ধনব্যবস্থা সাংবাদিকতা পেশাকে আরো মর্যাদাপূর্ণ করতে পারে। গণমাধ্যম আইন, সাংবাদিকতার নীতি, তথ্য অধিকার, তথ্য যাচাই, সংবিধানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং পেশাগত দক্ষতা, এসব বিষয়ে একটি মানসম্মত পরীক্ষা নিয়ে নিবন্ধন দেয়া হলে তা ভুঁইফোড় সাংবাদিকতার বিস্তার রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

কিন্তু এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, নিবন্ধন দেবে কে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে নিবন্ধন সাংবাদিকতার সুরক্ষা হবে, নাকি স্বাধীনতার জন্য হুমকি। যদি সরকার বা সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণাধীন কোনো প্রতিষ্ঠান ঠিক করে দেয় কে সাংবাদিক হবেন, তাহলে সেই ক্ষমতা ভবিষ্যতে অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করবে। কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির খবর কিংবা জনস্বার্থে প্রকাশিত তথ্যের কারণে যদি একজন সাংবাদিক তার নিবন্ধন হারানোর আশঙ্কায় থাকেন, তাহলে তিনি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন না। তখন সংবাদমাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রণ নয়, আত্মসেন্সরশিপ প্রতিষ্ঠা হবে। গণতন্ত্রে এটি হয়ে উঠতে পারে অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা একদিনে হারিয়ে যায় না; ধাপে ধাপে নিয়ন্ত্রণের কাঠামো তৈরি করেই সেটিকে সীমিত করা হয়। তাই নিবন্ধনের নামে এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত নয়, যা ভবিষ্যতের কোনো সরকার বা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর হাতে সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের কার্যকর অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।

এ কারণে সাংবাদিক নিবন্ধন যদি চালু করতেই হয়, তাহলে সেটি কোনো মন্ত্রণালয় বা সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন সংস্থার মাধ্যমে নয়; বরং একটি সাংবিধানিক বা আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন, স্বশাসিত ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কমিশনের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়া উচিত। সেই কমিশনে সাংবাদিক, সম্পাদক, গণমাধ্যম শিক্ষক, আইনজ্ঞ, মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ থাকতে হবে। নিবন্ধন বাতিলের সিদ্ধান্তও হতে হবে স্বচ্ছ তদন্ত, স্বাধীন শুনানি এবং আদালতে আপিলের সুযোগের ভিত্তিতে, সরকারের ইচ্ছায় নয়।

আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সাংবাদিকতার মান নির্ধারণের একমাত্র মাপকাঠি শিক্ষাগত ডিগ্রি হতে পারে না। বিশ্বে বহু খ্যাতিমান সাংবাদিক সাংবাদিকতা বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রিধারী নন। বাংলাদেশেও অনেক খ্যাতিমান সাংবাদিকের এমন ডিগ্রি ছিল না বা এখনও নেই। একজন সাংবাদিকের প্রকৃত যোগ্যতা তার অনুসন্ধানী দক্ষতা, তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা, ভাষাজ্ঞান, নৈতিকতা এবং জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতা। তাই যদি শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়ও, সেটি যেন অযৌক্তিকভাবে অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের পেশার বাইরে ঠেলে না দেয়।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব সাংবাদিক নির্ধারণ করা নয়; রাষ্ট্রের দায়িত্ব সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করা। একই সাথে পেশার মর্যাদা রক্ষায় ভুঁইফোড় সাংবাদিকতা, ভুয়া সংবাদমাধ্যম এবং পরিচয়পত্র বাণিজ্যের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়াও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এই দুই দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে প্রকৃত নীতি।

দেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ মতপ্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে। বাংলাদেশ স্বাক্ষরিত ‘International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR)’-এর ১৯ অনুচ্ছেদও স্বাধীন মতপ্রকাশকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফলে সাংবাদিক নিবন্ধনের যেকোনো কাঠামোকে অবশ্যই এই সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি জনগণের জানার অধিকার রক্ষার একটি সাংবিধানিক দায়িত্ব। আবার সাংবাদিকতার পরিচয়পত্র কখনোই চাঁদাবাজি, প্রভাব বিস্তার কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের লাইসেন্স হতে পারে না। তাই ভুঁইফোড় সাংবাদিকতা বন্ধ করতে হবে, কিন্তু প্রকৃত সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধও করা যাবে না।

বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন এক নিবন্ধনব্যবস্থা, যা যোগ্য সাংবাদিককে স্বীকৃতি দেবে, ভুঁইফোড়দের প্রতিরোধ করবে, পেশার মর্যাদা বৃদ্ধি করবে এবং একই সাথে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সাংবিধানিক সুরক্ষা দেবে। নিবন্ধনের লক্ষ্য হবে পেশাগত ঔৎকর্ষ, নৈতিকতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। কোনোভাবেই সংবাদ নিয়ন্ত্রণ নয়।

কারণ, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবাদিককে সত্য বলার সাহস রাষ্ট্র দিতে পারে না। সেই সাহস আসে স্বাধীনতা থেকে। আর স্বাধীনতাই সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি।

লেখক : শিক্ষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়

mahmud_raj@yahoo.com