গত ৭২ ঘণ্টায় ভারতের রাজনৈতিক কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামো থেকে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উল্লেখযোগ্য চেষ্টা দেখা গেছে। এর মধ্যে তাদের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে আলাদাভাবে দেখা করেছেন। দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ প্রধানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল আমাদের গোয়েন্দা সংস্থার সাথে বৈঠক করেছে। শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়ার পর থেকে বাংলাদেশ অব্যাহত বাড়তি বৈরিতার মুখে রয়েছে। পুশইন বাড়িয়েছে, সীমান্ত হত্যাও অব্যাহত। বাংলাদেশীদের ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া হয়েছে, সম্পর্কের উন্নয়ন চাইলে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। ভারতকে আমলে নিতে হবে বাংলাদেশে জুলাই-পরবর্তী বড় পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশ আগের মতো অধীনতার নীতি মেনে নেবে না।
বাংলাদেশের সাথে ভারতের আচরণ এমন যেন বাংলাদেশ তার অধীনস্থ রাষ্ট্র। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ভারত তার ইচ্ছা অনুযায়ী পরিচালনা করে। শেখ হাসিনার সময়ে বাংলাদেশ ভারতের কাছে আত্মসমর্পণ করে। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব এ কারণে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে ম্রিয়মাণ হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান মূলত ভারতের এই আধিপত্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের বিদ্রোহ। এরপর ভারতের প্রভাব বাংলাদেশে শূন্য হয়ে যায়। সেই সুযোগে দীর্ঘদিন পরে বাংলাদেশে অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন হয়েছে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, ভারত নির্বাচিত সরকারের সাথে পুরনো নীতি নিয়ে সম্পর্ক গড়তে এসেছে। হাসিনা পতনের দুই বছর পার হলেও তাদের নীতি পাল্টায়নি। বরং গত ৫ আগস্ট হাসিনাকে দিল্লিতে প্রকাশ্যে কথা বলতে দিয়ে কূটনৈতিক বিপর্যয় ঘটিয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নজিরবিহীন ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। এর পর ভারতের জোরালো কূটনৈতিক উদ্যোগ দেখা গেল।
ভারতকে বুঝতে হবে, সম্পর্ক উন্নয়নের বার্তা দিতে হবে কাজের মাধ্যমে। কৌশলগত চাল কিংবা ফাঁদ তৈরি করে একচেটিয়া ফায়দা আদায় করার দিন শেষ। বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে সাজাপ্রাপ্ত আসামি হাসিনার প্রত্যর্পণ, ভারতে আটক ওসমান হাদির হত্যাকারীদের ফিরিয়ে দেয়া। এছাড়া দণ্ডপ্রাপ্ত ও বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত যারা ভারতে পালিয়ে আছে সেইসব বাংলাদেশীকে ফিরিয়ে দিতে হবে। বন্ধুত্বের বার্তা দিতে হলে ভারত আমাদের দেশের অপরাধীদের আশ্রয় দিতে পারে না। এর বাইরে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা ইস্যুর নিষ্পত্তি করতে হবে। যৌথ নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা, সীমান্ত হত্যা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে রাখা, পুশইন, বাণিজ্যবৈষম্য বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সুযোগ পেলেই বাংলাদেশে হস্তক্ষেপের পুরনো নীতি পরিবর্তনের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দিতে হবে।
বড় দেশ হিসেবে ভারতের স্বার্থ সবসময় প্রাধান্য পেয়ে এসেছে। এ কারণে বাংলাদেশ বঞ্চিত হয়েছে। এখন দুই দেশের সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষায় সমমর্যাদা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে, আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী। ভারত ও বাংলাদেশ উভয়কে উভয়ের প্রয়োজন আছে। এখন সময় এসেছে দৃষ্টিভঙ্গি বদলের। ভারতের অবস্থান না পাল্টালে সম্পর্ক কখনই টেকসই হবে না।