চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার। এই অধিকার যেকোনো ব্যক্তিরই প্রাপ্য। তিনি বন্দী হোন কিংবা মুক্ত। অসুস্থ হলে যত দ্রুত সম্ভব তাকে চিকিৎসাসেবা দিতে হবে। কারাগারে বন্দীদের চিকিৎসাসেবা দেয়া আরো বেশি জরুরি; কিন্তু দেশের কারাগারগুলোতে চিকিৎসক সঙ্কট তীব্র। বন্দীর সংখ্যা বাড়লেও চিকিৎসক কিংবা চিকিৎসাসেবার মান বাড়েনি। ফলে বন্দীরা চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
একটি সহযোগী দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৭৫টি কারাগারে বন্দীর সংখ্যা প্রায় ৮৫ হাজার। এসব বন্দীর চিকিৎসার জন্য কারাগারে অনুমোদিত চিকিৎসকের পদ আছে ১৪১টি। অথচ কর্মরত আছেন মাত্র দু’জন। একজন রাজশাহীতে এবং অন্যজন মানিকগঞ্জ কারাগারে। বাকি পদগুলো বছরের পর বছর শূন্য পড়ে আছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর ১০৫ জন চিকিৎসককে প্রেষণে নিয়োগ দিলেও তারা সেখানে স্থায়ীভাবে থাকেন না। সপ্তাহে দু-এক দিন গিয়ে দায়সারাভাবে রোগী দেখেন।
কারাগারে শুধু চিকিৎসক সঙ্কট নয়, আছে অ্যাম্বুলেন্স সঙ্কটও। দেশের ৭৫টি কারাগারের বিপরীতে অ্যাম্বুলেন্স আছে মাত্র ২৭টি। বাকি ৪৮টি কারাগারে অসুস্থ বন্দীকে হাসপাতালে নিতে হলে বাইরে থেকে ভাড়া করা গাড়ি বা কারা কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করতে হয়। এতে অনেক সময়ক্ষেপণ হয়। স্থানান্তরের পথে বন্দী রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। কারা হাসপাতালে স্থায়ী চিকিৎসক না থাকায় বন্দী রোগীরা অনেকসময় বিপদে পড়েন। বিশেষ করে অস্থায়ী ভিত্তিতে রোগী দেখা চিকিৎসকরা চলে যাওয়ার পর কোনো বন্দী অসুস্থ হয়ে পড়লে। তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসা দেয়ার কোনো উপায় থাকে না। অথচ জেল কোড অনুযায়ী, কোনো বন্দী অসুস্থ হলে তাকে ২০ মিনিটের মধ্যে চিকিৎসক দেখাতে হয়। অনেকসময় চিকিৎসকের কাজ করেন নার্স কিংবা ফার্মাসিস্ট। এটি দুঃখজনক ও বিপজ্জনকও।
ফ্যাসিবাদী সরকার তার গত সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে কারাগারগুলো বিরোধী দল ও মতের মানুষ দিয়ে ভরে ফেলেছিল; কিন্তু কারাগারে স্থায়ী চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ নেয়নি। সে সময় কারাগারে অসুস্থতাজনিত মৃত্যুর সংখ্যাও ছিল বেশি। এখনো অবস্থার তেমন কোনো উন্নতি হয়নি।
কারাগারের হাসপাতালে চিকিৎসক নিয়োগের বিষয়টি স্বরাষ্ট্র ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে সম্পৃক্ত। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অতীতে কারাগারে চিকিৎসক নিয়োগের বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে; কিন্তু সমস্যার সমাধান হয়নি। অর্থাৎ— কারাগারের হাসপাতালগুলোতে শূন্য পদে চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া সম্ভব হয়নি। এটি ছিল একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা যা হাসিনার সরকারের কারণেই সম্ভব হয়েছে। কারাগারে বন্দীদের চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত রাখা মানবাধিকারের পরিপন্থী।
বর্তমানে দেশে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নে সবাই বিভোর। যে বাংলাদেশে সবার মৌলিক অধিকার সমান থাকবে। রাজনৈতিক কারণে কেউ বঞ্চনার শিকার হবেন না। আর নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রীও জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে বেশ সোচ্চার। আমরা বিশ্বাস করি, স্বরাষ্ট্র ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কারাগারে চিকিৎসক নিয়োগের বিষয়েও গুরুত্ব দেবে। বন্দীদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করবে।