সালাহ-মোস্তফা-বিতর্ক-ফিফা

Printed Edition

ক্রীড়া প্রতিবেদক

মিসরের নাইল ডেল্টার প্রত্যন্ত গ্রাম নাগরিগ, যে গ্রাম থেকে কেউ ফুটবলার হতে পারে সেটাই ছিল কল্পনাতীত। নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান হয়েও সেই স্বপ্ন দেখতেন মোহাম্মদ সালাহ। মাত্র ১২ বছর বয়সে আল মোকাওলুন আল আরবের যুবদলে সুযোগ পান। কিন্তু সেই সুযোগের মূল্য ছিল চড়া। প্রতিদিন অনুশীলনের জন্য তাকে কয়েকটি বাস-মাইক্রোবাস বদলে ৮-৯ ঘণ্টা পর্যন্ত যাতায়াত করতে হতো। এর মধ্যে আবার স্কুলও ছিল। স্কুলে ক্লাস করতেন মাত্র দুই-এক ঘণ্টা, তার পরই ছুটে যেতেন অনুশীলনে।

এভাবে একসময় সুযোগ আসে পেশাদার ক্যারিয়ারে। সেখানেও ভাগ্য সাথে থাকেনি। দেশটার পোর্ট সাইদ স্টেডিয়ামে ধ্বংসাবস্থার জন্য লিগ স্থগিত হয়ে যায়। সেই কঠিন সময়েই সুইজারল্যান্ডের এফসি বাসেলে সুযোগ পান সালাহ। সেখান থেকে চেলসিতে। কিন্তু চেলসি তাকে সুযোগ দেয়নি। দিনের পর দিন বেঞ্চে কাটিয়েছেন, একসময় ডিমোরালাইজডও হয়ে গিয়েছিলেন।

কিন্তু যার জীবন লড়াইয়ে ভরা, সে কি আর লড়াই করা থামায়? চেলসি থেকে গেলেন ইতালিয়ান লিগের ক্লাব ফিওরেন্তিনায়, সেখান থেকে রোমায়। তার পারফরম্যান্স নজর কাড়ে লিভারপুল স্কাউটদের, ইয়ুর্গেন ক্লপকে কনভিন্স করে তাকে সাইন করান ক্লাবটার স্কাউটরা। সেখান থেকে সালাহর লিভারপুলের বর্ণাঢ্য ইতিহাস শুরু।

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক রেকর্ড, একের পর এক গোল। তবে আফসোসও ছিল। ক্লাব ফর্ম দেশের জার্সিতে কনভার্ট করতে পারছিলেন না। অবশেষে পারলেন, এই বিশ্বকাপে পারলেন। এই বিশ্বকাপে মিশর যে ইতিহাস গড়েছে, তা ওই সালাহর কাঁধে চড়েই। যাকে ভালোবেসে সবাই ডাকেন, মিসরের মেসি... মিসরের কেউও যে ইউরোপ ডমিনেট করতে পারেন, সেটা সালাহই শিখিয়েছেন। খুব সম্ভবত ক্যারিয়ারের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচও খেলে ফেললেন সালাহ। আর দিয়ে গেলেন কত কত গল্প, ইতিহাস...

মোস্তফা সোবেইর

একটা সময় মিসরের মানুষ তাকে চিনত শুধু একটাই পরিচয়ে, দেশটার কিংবদন্তি গোলরক্ষক আহমেদ সোবেইরের ছেলে হিসেবে। কিন্তু এখন থেকে লোকে বলবে, মোস্তফা সোবেইর, যে বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির পেনাল্টি ঠেকিয়েছিল। শুধু পেনাল্টি সেভই না, অন্তত চারটা সেভ করেছেন মোস্তফা। বিশেষ করে ম্যাক অ্যালিস্টার আর হুলিয়ান আলভারাজের একদম নিশ্চিত গোল সেভ করে দেন। বাবার ছায়া পেরিয়ে মোস্তফা এখন বিশ্বকাপের নায়ক।

বাবা আহমেদ সোবেইর ছিলেন মিসরের ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক। তাই ছোটবেলা থেকেই সবাই ধরে নিয়েছিল, ছেলেও এক দিন গোলপোস্টের নিচেই দাঁড়াবে। কিন্তু কিংবদন্তির সন্তান হওয়া যেমন গর্বের, তেমনি কঠিনও। নেপোকিড বলে সমালোচনার শিকারও কম হতে হয়নি। শুরুতে সুযোগও কম পেয়েছেন। তবে যখনই পেয়েছেন কাজে লাগিয়েছেন। ২০২৪ সালে জাতীয় দলে সুযোগ আসে, এর পর থেকে দেশটার ফার্স্ট চয়েজ গোলকিপার মোস্তফা সোবেইর। আর ২০২৬ বিশ্বকাপে তো নিজেকে নতুন করে চেনালেন...

গ্রুপ পর্বে ইরানের বিপক্ষে মেহেদি তারেমির পেনাল্টি ঠেকিয়ে মিসরকে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট এনে দিয়ে রাউন্ড অব থার্টি টুয়ে তোলেন, শেষ ষোলোতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকেও আটকে দিচ্ছিলেন। ঠেকিয়ে দিলেন মেসির পেনাল্টিও... মিসর এই ম্যাচ হেরেছে বটে। কিন্তু যে পারফরম্যান্স মোস্তফা করলেন, নির্দ্বিধায় এই টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা গোলকিপিং পারফরম্যান্স...

রেফারি বিতর্ক ও ফিফা

ম্যাচ শেষ হওয়ার পর চার দিক থেকে ধেয়ে আসছে কনট্রোভার্সি বা বিতর্কের বিষাক্ত তীর। মিসরের একটি গোল বিল্ড-আপের শুরুতে ফাউলের অজুহাতে বাতিল হওয়া। অন্য দিকে সালাহকে করা একটি ক্লিয়ার ফাউলের পর ভিএআর চেক না করেই আর্জেন্টিনাকে গোল দেয়া! মিসরের সমর্থকরা কেঁদেছে। একটু ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় ফুটবলের অভিধানে ‘বিতর্ক’ ছাড়া কি আজ পর্যন্ত কোনো মহাকাব্য লেখা হয়নি। ১৯৬৬ সালে জিওফ হার্স্টের সেই ভুতুড়ে গোল, ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’, ২০১০ সালে ল্যাম্পার্ডের বাতিল হওয়া গোল... ইতিহাস তো এমন হাজারো বিতর্কের কঙ্কাল দিয়ে তৈরি।

কোনো রকম কনট্রোভার্সি ছাড়া বিশ্বকাপ জিতেছে, এমন দৃষ্টান্ত ফুটবল ইতিহাসে খুব কমই আছে। ওই সব হলো ‘পার্ট অব দ্য গেম’ বা এই নির্মম থিয়েটারেরই একটি অলিখিত অংশ। রেফারিরা মানুষ, আর মানুষের ভুল বা সিদ্ধান্ত ফুটবলের সেই প্রাচীন ডিএনএর অংশ, যা নিয়ে যুগের পর যুগ চায়ের কাপে ঝড় ওঠে। মাঠের এই বিতর্কের আড়ালে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে, তা হলো মিসরের সেকেন্ড গোলটি (যা বাতিল হয়েছিল) হওয়ার পর ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফানতিনোর রিঅ্যাকশন!

ক্যামেরার লেন্সে পরিষ্কার দেখা গেছে, ইনফানতিনো যেন আক্ষরিক অর্থেই আর্জেন্টিনার পক্ষে! তার শারীরিক ভাষায় একটা চাপা স্বস্তি বা উৎকণ্ঠা কাজ করছিল। আর এটি দেখেই চার দিকে রব উঠেছে... আর্জেন্টিনা টাকা দিয়ে ফিফাকে কিনে নিয়েছে! ইনফ্লুয়েন্স খাটিয়ে ম্যাচ জিতেছে! আর্জেন্টিনা এমন কেউ না, যার কাছে ফিফা সোল্ড আউট হয়ে যাবে। কোনো কমিটি টিম বা হেনতেন বলে এই জয়কে ছোট করাটা স্রেফ একটা হাস্যকর প্রলাপ।

ইনফানতিনোর ওই রিঅ্যাকশনের পেছনের আসল মনস্তত্ত্বটা খুবই সহজ। তার জায়গায় যদি কেউ ওই জায়গায় বসতেন, ওই ভিআইপি বক্সে বসে থাকতেন, তবে তারাও সাবকনসাশ মাইন্ডে বা বেখেয়ালি হয়ে একই রিঅ্যাকশন দিতেন! কারণ ফিফা কোনো চ্যারিটি বা দাতব্য সংস্থা নয়; ফিফা হলো মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের এক বিশাল করপোরেট বিজনেস। আর ইনফানতিনো হলেন সেই বিজনেসের সিইও বা ম্যানেজার। একজন বিজনেসম্যান হিসেবে সবাই চাইবেন এমন দলগুলো ফাইনাল খেলুক, যাদের দেখলে আপনার ব্রডকাস্টিং রাইটস, স্পনসরশিপ আর জার্সির বিক্রি আকাশ ছুঁয়ে যাবে। মিসরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা যদি রাউন্ড অব সিক্সটিন বা কোয়ার্টারে বাদ পড়ে যায়, তবে ফিফার এই বিশাল মেগা-ইভেন্টের বিলিয়ন ডলারের বিজনেসে একটা ধস নামবে! আর্জেন্টিনার মতো ‘ক্যাশ-কাউ’ বা সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া প্রোডাক্টকে টুর্নামেন্টে বাঁচিয়ে রাখাটা ফিফার ইকোসিস্টেমের জন্যই জরুরি। এটা দুর্নীতি নয়; এটা হলো করপোরেট ক্যাপিটালিজম বা পুঁজিবাদের এক অমোঘ, নগ্ন বাস্তবতা!

কিছু মাইনর ব্যাপার তো থাকেই। ফুটবলে বড় ম্যাচে রেফারির বাঁশি একটু হলেও বড় দলের পক্ষেই বেশি যাবে। এটি লাভ-ক্ষতির মামলা। ম্যাচ শেষে প্রেস কনফারেন্সে মিসরের কোচ যখন বঞ্চনার কথা তুলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন, তখন সেই দৃশ্যটি খুব চেনা মনে হয়েছিল উপস্থিত সবার কাছে কিংবা মিডিয়ার কল্যাণে যারা দেখছিলেন।

ক্রিকেটের ময়দানও এর ব্যাতিক্রম নয়। ভারতের সাথে যখন বাংলাদেশ বা অন্য কোনো ছোট দল খেলে, তখন মাঠে আম্পায়ারের ৫০-৫০ সিদ্ধান্তগুলো অবধারিতভাবেই ভারতের পক্ষেই যায়। এটি নিয়ে কেউ কাঁদে, কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করে, কিন্তু দিনশেষে ওই করপোরেট সিস্টেমের কাছে সবাই হার মানতে বাধ্য। ফুটবলেও মিসরের সাথে সেটাই হয়েছে। এটি কোনো ষড়যন্ত্র নয়, এটি হলো জিও-পলিটিক্স আর স্পোর্টস ইকোনমির এক নির্মম বাস্তবতা। থার্ড ওয়ার্ল্ড বা ছোট দলগুলোকে এই করপোরেট কলোসিয়ামে বেঁচে থাকতে হলে শুধু ভালো খেললেই হয় না, তাদের লড়তে হয় রেফারি, সিস্টেম আর ওই ভিআইপি বক্সের অদৃশ্য অ্যালগরিদমের বিরুদ্ধেও!