ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পতনের পর আইনশৃঙ্খলার বড় বিপর্যয় ঘটে। অন্তর্বর্তী সরকার বিধ্বস্ত পুলিশ বাহিনী নিয়ে কোনোরকমে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। বড় বড় অপরাধীদের আটক ও বিচারে গড়িমসি হওয়ায় মানুষের মধ্যে বিপুল ক্ষোভ বিরাজ করেছে। তার কিছু প্রতিক্রিয়া দেশব্যাপী দেখা গেছে। সে অবস্থার এখনো খুব বেশি উন্নতি হয়নি। এছাড়া পুনর্গঠন করে পুলিশের নির্দেশনা কাঠামো পুনঃস্থাপন করতে না পারার দুর্বলতাও মোটাদাগে ভুগিয়েছে। তার প্রভাব এখনো দৃশ্যমান। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করায় পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন আশা করা হচ্ছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে পুলিশ পেশাদারি অবস্থান গ্রহণ করলে তা সম্ভব হতে পারে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করেছেন। এক ভার্চুয়াল বৈঠকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার যুক্ত হন। আলোচনায় উঠে আসে জননিরাপত্তা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও মাদকের বিষয়। দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধ বিবেচনায় নিয়ে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে ওই বৈঠকে মহাপরিদর্শকের পক্ষ থেকে। সরকারি দলের প্রতি ঝুঁকে পড়া আমাদের পুলিশি ব্যবস্থায় অন্যতম দুর্বলতা। বিগত সরকারগুলোর সময় পুলিশের এ ধরনের আচরণে দেশবাসী ভুগেছে। সরকারি দলের লোকদের জন্য সাতখুন মাফ ছিল। অন্যদিকে বিরোধীদের পান থেকে চুন খসলে রেহাই ছিল না। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের সময় পুলিশ দলীয় বাহিনীতে পরিণত হয়। গুম-খুনসহ বিরোধীদের উৎখাতের কাজ করানো হয়েছে তাদের দিয়ে। এ সুযোগে অপরাধীদের জন্য হয় পোয়াবারো। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুলিশের কার্যক্রমের অনেকটা পরিবর্তন আসে। বর্তমান দলীয় সরকারের অধীনে পুলিশের আচরণ কেমন হবে তার দিকে সবার নজর। পুলিশ কি পুরনো দলীয় সরকারের মেজাজে ফিরে যাবে, সে দ্বিধা আছে। আইজিপির এই নির্দেশনা সত্যিকার অর্থে বাস্তবায়ন হলে আশা করা যায়, পুলিশ পুরনো ব্যবস্থায় ফিরবে না।

বৈঠকে পুলিশের মধ্যে থাকা বঞ্চনা ও অসন্তুষ্টির বিষয় সামনে এসেছে। নতুন পোশাক দেয়ার আগে তাদের পক্ষ থেকে মতামত গুরুত্ব দেয়া হয়নি। এই পোশাক একেবারে সাধারণ, নিরাপত্তাকর্মীদের সাথে মিলে যায়। এতে পুলিশের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয় এবং তাদের প্রতি সমীহ কমে যায়। থানাগুলোতে পর্যাপ্ত যান না থাকায় তাদের অভিযানে বের হতে বেগ পেতে হচ্ছে। এসব অনুযোগ ও অভাব আমলে নেয়ার পাশাপাশি পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বডিওর্ন ক্যামেরার ব্যবহার যথাযথ করতে হবে। কর্মে নিয়োজিত থাকার সময় পুলিশকে পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকতে হবে। এতে করে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও জনহেনস্তার যে সংস্কৃতি আছে, তা বন্ধ হবে। মহাসড়কে ডাকাতি বন্ধ ও দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সমন্বয়হীনতার অভিযোগের বিষয়টি আলোচনায় আসে। থানা পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশের মধ্যে দায়িত্ব পালন নিয়ে ঠেলাঠেলি ও বিরোধ দেখা দেয়। এ কারণে সময়মতো স্পটে পুলিশ কার্যকর হয় না। ফলে চাঁদাবাজির ঘটনাসহ মহাসড়কে নানাবিধ অপরাধ সংঘটিত হয়।

‘অপরাধ করলেই গ্রেফতার’ আইজিপির এ নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। দেশের জনগণ পুলিশের কাছে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা দেখতে চায়। নতুন সরকার পুলিশের এ পেশাদার অবস্থানকে উৎসাহ জোগালে নিঃসন্দেহে দেশ ভালো শাসন পাবে।