খালের দখল-দূষণ শুধু ঢাকা শহরে নয়, রাজধানীর বাইরে জেলা-উপজেলা শহরেও ছড়িয়ে পড়েছে। যে যার মতো খাল দখল করে ভোগ করছে, দূষণ করছে। অথচ স্থানীয় মানুষের সুবিধায় এসব খাল দখল-দূষণমুক্ত রাখা উচিত ছিল। কারণ আমরা লক্ষ করছি, ঢাকার অনেক খাল দখল হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতে এই শহরের নানা স্থান পানিতে তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। এখন জেলা-উপজেলা শহরেরও এমন হচ্ছে। প্রকৃতির দান বিনষ্ট করলে প্রকৃতি নিজেই এর প্রতিশোধ নেয়।
কুমিল্লার দক্ষিণাংশের ‘প্রাণ’ বলা হয় বেরুলা খালকে। এ খাল ঘিরে ধান ও মাছে সমৃদ্ধ ছিল লাকসাম, মনোহরগঞ্জ ও নাঙ্গলকোট উপজেলা। দখল, দূষণ আর অপরিকল্পিত নির্মাণে খালটি আজ মৃতপ্রায়। দখল হয়ে গেছে দুই-তৃতীয়াংশ। হারিয়ে গেছে দেশী মাছের উৎস। কমছে ফসল উৎপাদন। পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় গত বর্ষার পর কয়েক লাখ মানুষ দুই মাস পানিবন্দী ছিলেন। এসব তথ্য উঠে এসেছে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, লাকসামের ডাকাতিয়া নদীর ফতেপুর এলাকায় খালটির উৎপত্তি। কুমিল্লা-নোয়াখালীর আঞ্চলিক মহাসড়কের গা ঘেঁষে খালটি ৬০ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে নোয়াখালীর চৌমুহনী পর্যন্ত গেছে। মহাসড়ক সম্প্রসারণ করায় খালটি সঙ্কুচিত হয়ে যায়। সেই সুযোগ লুফে নেয় দখলদাররা। গত দেড় দশকে বেরুলাসহ এ অঞ্চলের প্রায় সব ক’টি খাল দখল করে বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পুকুর, রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। যে যেভাবে পারছে, খাল দখল করছে। ফতেপুরে খালের ওপর বাঁশ বাজার বসানো হয়েছে। ভাটিয়াভিটা ও নোয়াগাঁওয়ে গড়ে উঠেছে বাড়ি, দোকান। একই অবস্থা কালিয়া চৌ ও উত্তরদা এলাকায়। সেখানে খালের ওপর কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। খিলা, নাথেরপেটুয়া ও বিপুলাসার বাজারের পাশে নির্মাণ করা হয়েছে দোকানপাট।
আমরা এমন রাষ্ট্রে বাস করি, যে দেশে প্রশাসনের নাকের ডগায় অনিয়ম-দুর্নীতি ও অপরাধ হলেও আবেদন না করা পর্যন্ত প্রতিকার মেলে না। এতে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, প্রশাসনের নিজস্ব দায়িত্ব বলে কী কিছু নেই? স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় প্রশাসন কী খালের দখল-দূষণ দূর করতে পারে না? খাল পুনর্খনন ও উদ্ধারে কেন জনগণের লিখিত আবেদনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে?
উন্নত অনেক রাষ্ট্রে খালের নান্দনিক ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়। বড় বড় খাল ঘিরে নৌপর্যটন গড়ে তোলে। এসব নৌপর্যটনকে কেন্দ্র করে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশেও বড় বড় খাল ঘিরে নৌপর্যটন গড়ে উঠতে পারে। কিন্তু যেখানে দখল-দূষণ দূর করা সম্ভব হচ্ছে না, সেখানে পর্যটনের সম্ভাবনার বাস্তব রূপ দেয়া কিভাবে সম্ভব?
তাই আগে দখল-দূষণে নষ্ট হওয়া খালগুলো উদ্ধার করে সেগুলোতে আশির দশকের মতো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে পুনর্খনন কর্মসূচি নিতে হবে। এতে করে যেমন খালগুলো আবার প্রাণ ফিরে পাবে: ঠিক তেমনি এর শৈল্পিক ও বাণিজ্যিক ব্যবহার করাও সম্ভব হবে।