মানসম্মত ও টেকসই শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব। স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও নিজেদের উপযোগী একটি শিক্ষাব্যবস্থা আমরা প্রণয়ন করতে পারিনি। ফলে বৈশ্বিক পর্যায়ে আমাদের শিক্ষার্থীরা অন্যান্য দেশের ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
আমাদের শিক্ষার এমন হালের জন্য একাধিক শিক্ষাপদ্ধতির পাশাপাশি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনাপদ্ধতিও অনেকাংশে দায়ী। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বড় অংশ পরিচালিত হয় বেসরকারি পর্যায়ে। মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে প্রায় ৩৫ হাজার। লাখো শিক্ষার্থী এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা লাভ করে।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ, সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পরিচালনা পর্ষদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সভাপতি প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একসময় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতি হতে শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রয়োজন হতো না। ২০২৪ সালে নিম্নমাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা সংশোধন করে সভাপতি হতে শিক্ষাগত যোগ্যতা কমপক্ষে এইচএসসি বা সমমানের (উচ্চমাধ্যমিক) ডিগ্রি করা হয়। ২০২৫ সালে সভাপতি হওয়ার যোগ্যতা আরো বাড়িয়ে কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি হতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অথবা চার বছর মেয়াদি স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রি থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়। আর স্কুলের ক্ষেত্রে স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রি বাধ্যতামূলক করা হয়।
এখন আবার সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করা এমনকি বাধ্যবাধকতা উঠিয়ে দেয়ার আলোচনা চলছে। গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে শিক্ষামন্ত্রীর উপস্থিতিতে সব শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানদের নিয়ে এ আলোচনা হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান লক্ষ্য জ্ঞানচর্চা, মূল্যবোধের বিকাশ ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। যদি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনাকারী প্রধান ব্যক্তির শিক্ষার মৌলিক ধারণা ও নীতিমালা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকে, তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে একাডেমিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য তহবিল সংগ্রহ, বরখাস্ত, বাতিল বা অপসারণ, নৈমিত্তিক ছুটি মঞ্জুর করা— ইত্যাদি পরিচালনার কাজ কমিটির হাতে। উন্নয়ন প্রকল্পের সাথে সম্পর্কিতসহ বার্ষিক বাজেট অনুমোদন, সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ, সংরক্ষিত ও সাধারণ তহবিল, অন্যান্য তহবিল, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বিলে সই করাসহ প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগ কাজ হয় পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে।
অনেক সময় দেখা যায়, স্থানীয় প্রভাব বা রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। এতে শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টি উপেক্ষিত থাকে। ফলে শিক্ষকদের সাথে অপ্রয়োজনীয় দ্বন্দ্ব, প্রশাসনিক জটিলতা এবং শিক্ষার মান অবনমনের মতো সমস্যা দেখা দেয়। একজন শিক্ষিত ও দূরদর্শী সভাপতি এসব সমস্যা সমাধানে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা কেবল প্রশাসনিক কাজ নয়; এটি একটি দায়িত্বশীল সামাজিক ভূমিকা। যোগ্য সভাপতি পারেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় করতে। গ্রহণ করতে পারেন প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এ জন্য তার শিক্ষাগত ভিত্তি শক্ত হওয়া অপরিহার্য। তাই সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতায় ছাড় দেয়ার সুযোগ আছে বলে আমরা মনে করি না; বরং বর্তমান মানদণ্ড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী ও কার্যকর করতে নেতৃত্ব থাকতে হবে যোগ্য, শিক্ষিত ও দায়িত্বশীল ব্যক্তির হাতে।