আর মাত্র পাঁচ দিন পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। সাধারণত প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজনৈতিক দলগুলো প্রথাগতভাবে নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে থাকে। এবারো ইশতেহার ঘোষণা শুরু করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি দল নিজেদের ইশতেহার ঘোষণা করেছে। ইশতেহার দলীয় কর্মসূচি নয়; বরং জাতির সামনে দলটির প্রতিশ্রুত একটি দলিল।

বাংলায় গৃহীত ‘ইশতেহার’ ল্যাটিন ম্যানিফেস্টাম থেকে এসেছে, যার অর্থ স্পষ্ট বা সুস্পষ্ট। নির্বাচনী ইশতেহার হলো সাধারণ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর পক্ষ থেকে প্রকাশিত একটি লিখিত অঙ্গীকারনামা বা পরিকল্পনা দলিল, যেখানে ক্ষমতায় গেলে দেশের জন্য কী কী কাজ করা হবে তার রূপরেখা। এটি জনগণের সাথে দলের একটি সামাজিক চুক্তি, যার মাধ্যমে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়। আমাদের দেশে এই ইশতেহার নিয়ে ভোটারদের মধ্যে খুব একটা আগ্রহ এর আগে দেখা যায়নি। কারণ, বাংলাদেশে ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি পালনের বিশেষ রেওয়াজ নেই। তবে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারার নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নির্বাচনী ইশতেহার গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এ কথা সত্যি, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী দেশের পুরনো বন্দোবস্তের পরিবর্তে নতুনভাবে রাষ্ট্রযন্ত্র ঢেলে সাজানোর জন-অভিপ্রায় বেশ স্পষ্ট। তাই নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে এবার জনমনে বেশ কৌতূহল ও আগ্রহ দেখা দিয়েছে। কোন দল কী ইশতেহার দিচ্ছে তা নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা হচ্ছে। এটি ভোটারদের রাজনৈতিক সচেতনতার বহিঃপ্রকাশ। এ জন্য এবার যেনতেন নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে পরবর্তীতে তা উপেক্ষা করা কষ্টসাধ্য হবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। গত বুধবার সন্ধ্যায় প্রকাশিত ওই ইশতেহারে দলটি বলেছে, সরকার গঠন করলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ২৬টি বিষয়ে কাজ করবে। এর মধ্যে রয়েছে যুবক্ষমতায়ন, নারীনিরাপত্তা, প্রযুক্তিনির্ভর সমাজ, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ। ইশতেহারের মূল স্লোগান- ‘ইনসাফ, সুশাসন ও কর্মসংস্থান’ শুধু প্রতিশ্রুতির তালিকা নয়; বরং এটি রাষ্ট্র সংস্কারের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা। জামায়াতের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্তেজনা, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, দুর্নীতি ও সামাজিক অসঙ্গতি বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে জটিলতায় ফেলেছে। জামায়াত বলেছে, দলটির ইশতেহার কেবল ভোটারদের উদ্দেশ্যে নয়; এটি সমগ্র রাষ্ট্রকাঠামোর পুনর্গঠনের শ্রতিশ্রুতি। এবারের নির্বাচনে এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ইশতেহারে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সবগুলোতে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে।

ইশতেহারে দেয়া দলগুলোর প্রতিশ্রুতি যেন শুধু কথার কথা না হয়। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনী ইশতেহার ব্যাপকভাবে গুরুত্ব দিতে দেখা যায়। সেখানে ইশতেহার মানে কাঁধে গুরুদায়িত্ব নেয়ার প্রতিজ্ঞা করা। ক্ষমতায় গেলে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বেশির ভাগ বাস্তবায়ন করে।

বর্ষা বিপ্লবে নতুন এক বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে, যেখানে জনগণ উন্নত গণতান্ত্রিক আদর্শের বাস্তবায়ন চায়। সঙ্গত কারণে এবার মানুষ চাইবে ইশতেহারে দেয়া প্রতিশ্রুতি সরকারে এসে বাস্তবায়ন করবে। এমনকি বিরোধী দলে গেলেও কেমন আচরণ করবে সে কথাও বলুক। এখন দেখার বিষয়, ভোটাররা কোন দলকে কী প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে ভোট দেবেন।