মধ্যপ্রাচ্যে সঙ্ঘাতের বিস্তার, জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা ও দীর্ঘ যুদ্ধের ইঙ্গিত
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিরোধ যুদ্ধ এখন ক্রমেই জটিল ও বিস্তৃত রূপ নিচ্ছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহের মাথায় সঙ্ঘাত শুধু ইরান ও ইসরাইলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে ইরাক, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে।
১১ মার্চ যুদ্ধের ১২তম দিনে সংঘর্ষ আরো তীব্র হয়। তেহরান দাবি করেছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১০ হাজার বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে, যাতে এক হাজার ৩০০-এর বেশি সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছে। অন্য দিকে ইরানও পাল্টা আক্রমণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তাদের ‘অপারেশন ট্রু প্রমিস-৪’-এর ৩৭তম ঢেউ ছিল এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভারী হামলা, যেখানে সুপার-হেভি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
রাত : তেহরানে তীব্র বিমান হামলা
মঙ্গলবার গভীর রাতে ইসরাইলি বিমান হামলায় ইরানের রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। স্থানীয় সূত্র ও উদ্ধার সংস্থাগুলো জানিয়েছে, শহরের কেন্দ্রীয় আবাসিক এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণ ঘটে। ইরানি রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, একটি বহুতল আবাসিক ভবন সরাসরি হামলার শিকার হয় এবং ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের উদ্ধারে অভিযান চালানো হচ্ছে। একই সময়ে তেহরানের মেহরাবাদ বিমানবন্দরসহ সামরিক ও অবকাঠামোগত লক্ষ্যবস্তুও হামলার শিকার হয়েছে বলে ইরানি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন।
সকাল : বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির নতুন হিসাব
সকালে ইরানের কর্মকর্তারা যুদ্ধের নতুন ক্ষয়ক্ষতির হিসাব প্রকাশ করেন। তাদের দাবি অনুযায়ী প্রায় ১০ হাজার বেসামরিক স্থাপনা হামলার শিকার; এক হাজার ৩০০-এর বেশি সাধারণ নাগরিক নিহত; হাজার হাজার মানুষ আহত হয়।
জাতিসঙ্ঘে ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি আমির সাঈদ ইরাভানি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল পরিকল্পিতভাবে আবাসিক এলাকা, হাসপাতাল ও নাগরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে।
দুপুর : আইআরজিসির ৩৭তম ঢেউ
দুপুরের দিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস ঘোষণা করে যে তারা ‘ট্রু প্রমিস-৪’ অপারেশনের ৩৭তম ঢেউ শুরু করেছে। এই হামলা প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলে এবং এতে ব্যবহার করা হয় সুপার-হেভি খোররামশাহর-৪ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। ইরানের দাবি অনুযায়ী হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল- তেল আবিবের দক্ষিণে হা’এলা স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্র; হাইফা ও পশ্চিম জেরুজালেমের সামরিক স্থাপনা; ইরাকের এরবিলে মার্কিন ঘাঁটি এবং বাহরাইনের মানামায় মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সংশ্লিষ্ট স্থাপনা।
আইআরজিসি জানিয়েছে, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তাদের হামলা তত বেশি তীব্র হবে। বিকেল : উপসাগরীয় অঞ্চলে সতর্কতা
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কায় উপসাগরীয় দেশগুলোতে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়। সৌদি আরব জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
কাতার বলেছে, দেশটির দিকে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে এবং নাগরিকদের ঘরে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তারা ২৬টি ড্রোন ধ্বংস করেছে। বাহরাইনে জরুরি সাইরেন বাজার পর বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
সন্ধ্যা : তেল স্থাপনায় হামলার প্রভাব
ইরানের তেল ডিপোতে হামলার পর আগুন ও ধোঁয়ার কারণে পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, ধোঁয়া বৃষ্টির মেঘের সাথে মিশে ‘ব্ল্যাক রেইন’ বা দূষিত বৃষ্টি তৈরি করতে পারে। এতে বিষাক্ত রাসায়নিক থাকতে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
রাত : জ্বালানি বাজারে ধাক্কা
ড্রোন হামলার আশঙ্কায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিশ্বের অন্যতম বড় তেল শোধনাগার রুয়াইস রিফাইনারি সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।
একই সময়ে হরমুজ প্রণালীর কাছে দু’টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার খবর পাওয়া যায়, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
কৌশলগত বিশ্লেষণ
১. যুদ্ধের নতুন ধাপ : আঞ্চলিক বিস্তার : এই সঙ্ঘাত এখন আর শুধু ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে এখন রয়েছে- মার্কিন সামরিক ঘাঁটি; উপসাগরীয় মিত্র রাষ্ট্রগুলো ও সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ।
এটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, যুদ্ধ ধীরে ধীরে আঞ্চলিক সঙ্ঘাতে পরিণত হচ্ছে।
২. ইরানের ‘দীর্ঘ যুদ্ধ’ কৌশল : ইরান শুরু থেকেই একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের কৌশল গ্রহণ করেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
এই কৌশলের প্রধান উপাদানগুলো হলো- ধাপে ধাপে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা; আঞ্চলিক মিত্রদের সক্রিয় করা; জ্বালানি সরবরাহে চাপ সৃষ্টি করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র রাষ্ট্রগুলোকে নিরাপত্তা সঙ্কটে ফেলা। এই কৌশলকে অনেক বিশ্লেষক ‘মোজাইক প্রতিরক্ষা’ বলেও উল্লেখ করছেন।
৩. যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের লক্ষ্য : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ অভিযানের লক্ষ্য হিসেবে কয়েকটি বিষয় সামনে এসেছে- ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা; ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ধ্বংস করা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে দীর্ঘ যুদ্ধ শুরু হলে এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে যেতে পারে।
৪. জ্বালানি বাজারে বৈশ্বিক প্রভাব : মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ মানেই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তেল পরিবহনের প্রধান পথ। যদি এই পথ ঝুঁকির মুখে পড়ে, তাহলে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে পারে; বৈশ্বিক অর্থনীতি চাপের মুখে পড়তে পারে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোও এর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে না।
৫. রাজনৈতিক চাপ ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা : ওয়াশিংটনে যুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। মার্কিন কংগ্রেসের কিছু সদস্য যুদ্ধের লক্ষ্য ও কৌশল নিয়ে প্রকাশ্য শুনানি দাবি করেছেন।
অন্য দিকে কাতারসহ কয়েকটি দেশ সঙ্ঘাত কমানোর জন্য কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়েছে। যুদ্ধ কোথায় গড়াতে পারে : ১২ দিনের যুদ্ধ ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকে নতুন অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। যদি সঙ্ঘাত আরো দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে কয়েকটি সম্ভাবনা সামনে আসতে পারে- আঞ্চলিক পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ; জ্বালানি সরবরাহে বড় সঙ্কট এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সরাসরি জড়িত হওয়া।
তবে ইতিহাস বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাত প্রায়ই দ্রুত বিস্তার লাভ করলেও শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক পথেই সমাধান খোঁজা হয়। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সঙ্ঘাতের ১২তম দিন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। পাল্টা হামলা, আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং জ্বালানি বাজারে চাপ- সবমিলিয়ে এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করতে পারে। পরিস্থিতি যদি একইভাবে অব্যাহত থাকে, তাহলে এই সঙ্ঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্ব-অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকাঠামোর ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।