ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু

নয়াপল্টনের চেনা বারান্দায় রিজভীর নতুন যাত্রা

Printed Edition
3rd-3
নয়াপল্টনের চেনা বারান্দায় রিজভীর নতুন যাত্রা

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল

দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বিএনপির নয়াপল্টন কার্যালয় ও রুহুল কবির রিজভী যেন একসূত্রে গাঁথা। রাজপথের আন্দোলন, কার্যালয়কেন্দ্রিক সংবাদ সম্মেলন কিংবা প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই ভবনটিকেই তিনি নিজের রাজনৈতিক ঠিকানা বানিয়ে নিয়েছিলেন। এবার সেই পরিচিত ভবনেই নতুন ও সর্বোচ্চ সাংগঠনিক ভূমিকায় বসলেন তিনি।

ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের পরিচিত ঠিকানা নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কাজ শুরু করেছেন রিজভী। রোববার দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বেলা ১১টার দিকে নয়াপল্টন কার্যালয়ে দাফতরিক কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেন তিনি। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর শূন্য হওয়া পদে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গঠনতন্ত্রের ৭ (খ-৬) ধারা বলে রিজভীকে এই দায়িত্ব দেয়া হয়।

ছাত্ররাজনীতি থেকে দলের শীর্ষ পদ

রুহুল কবির রিজভীর রাজনৈতিক জীবন শুরু ছাত্ররাজনীতির মধ্য দিয়ে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক ও পরে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৮৯ সালে রাকসু নির্বাচনে ভিপি নির্বাচিত হন এবং এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে আহত হন। ১৯৯২ সালে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে ভোটের মাধ্যমে সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতৃত্ব দেন। পরে বিএনপির রাজনীতিতে তার সম্পৃক্ততা আরো গভীর হয়।

সংসদ সদস্য না হলেও বিএনপির জাতীয় রাজনীতিতে দফতরকেন্দ্রিক কাজের মাধ্যমে রিজভী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নেন। ২০১৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের পর সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পান তিনি। এরপর টানা প্রায় এক দশক দলের কর্মসূচি, সিদ্ধান্ত ও গণমাধ্যমে বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার মূল দায়িত্বে ছিলেন তিনি। সম্প্রতি বিএনপি সরকার গঠনের পর তিনি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টার দায়িত্ব পান। এরপর গত ১৫ আগস্ট তাকে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয় এবং ২০ আগস্ট দেয়া হয় ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব।

কার্যালয়ের সাথে দীর্ঘদিনের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক

বিরোধী রাজনীতির কঠিন সময়ে নয়াপল্টনের কার্যালয়ই ছিল রিজভীর প্রধান ঘাঁটি। ২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারি থেকে রাজনৈতিক সঙ্কটের মধ্যে দলীয় কার্যক্রম সচল রাখতে তিনি টানা কার্যালয়ে অবস্থান করেন। এমনকি কার্যালয়ের তৃতীয় তলার একটি কক্ষে বিছানা পেতে টানা ৭৮৭ দিন বাসাবাড়ি ও স্বজনদের ছেড়ে সেখানে রাত্রিযাপন করেছিলেন। পরে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ বেগম খালেদা জিয়া মুক্তি পাওয়ার পর তিনি ঘরে ফেরেন।

২০১৩ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনের সময় নয়াপল্টন কার্যালয় থেকে এবং ২০২২ সালের ৭ ডিসেম্বর দলীয় কার্যালয়ে পুলিশের অভিযানের পরও তাকে গ্রেফতার করা হয়। শুধু তা-ই নয়, গুরুতর অসুস্থতা বা পায়ে বুলেট লেগে আহত থাকা সত্ত্বেও হুইলচেয়ারে বসে তিনি নয়াপল্টন থেকে দলের সংবাদ সম্মেলন ও সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন।

তৃণমূলের যোগাযোগ ও নতুন চ্যালেঞ্জ

তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে নয়াপল্টন কার্যালয় মানেই ছিল রিজভীর সহজলভ্য উপস্থিতি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নেতাকর্মীরা কার্যালয়ে এসে তার কাছে দুঃখ-কষ্টের কথা বলতে পারতেন। গভীর রাতেও মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা গ্রেফতার বা হামলার শিকার হলে তিনি তাৎক্ষণিক বিবৃতি ও স্থানীয় প্রশাসনের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে পদক্ষেপ নিতেন।

বর্তমানে বিএনপি সরকারে থাকায় রিজভীর সামনে বেশ কিছু নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে। শুধু রাজপথ বা দফতরের খবর প্রচার নয়, এখন সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দলকে শক্তভাবে ধরে রাখা, মাঠপর্যায়ের সাথে কেন্দ্রের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ জোরদার করা এবং দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা করা তার অন্যতম বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নতুন দায়িত্ব গ্রহণ নিয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে কিছুটা আত্মসংশয়ের কথা জানিয়ে রিজভী উল্লেখ করেন, এত বড় দায়িত্ব তিনি কতটা যথাযথভাবে পালন করতে পারবেন তা নিয়ে এক ধরনের উদ্বেগ কাজ করছে। তবে দলের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সহকর্মীরা মনে করছেন, দায়িত্বকে বড় করে দেখার এই মানসিকতাই তাকে এতদিন ধরে একজন নিবেদিত কর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

নয়াপল্টনের যে কক্ষে বসে এক সময় তিনি দলের মুখপাত্র হিসেবে প্রতিদিন বার্তা পৌঁছে দিতেন, সেখান থেকেই এখন পুরো বিএনপির প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক মূল চালিকাশক্তি হিসেবে নতুন অধ্যায় শুরু করলেন রুহুল কবির রিজভী।