সঙ্কুচিত হচ্ছে গাজা পুনর্গঠন পরিকল্পনা : ক্ষুদ্র পাইলট প্রকল্পে ঝুঁকছে ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস

গাজায় থামছে না ইসরাইলি হামলা, শিশুসহ হতাহতের সংখ্যা বাড়ছেই

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

গাজা পুনর্গঠনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা এখন অনেকটাই সঙ্কুচিত হয়ে একটি ক্ষুদ্র পরীক্ষামূলক প্রকল্পে সীমাবদ্ধ হয়েছে। শুরুতে পুরো গাজা উপত্যকার পুনর্গঠন, অবকাঠামো পুনরুদ্ধার এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনের যে পরিকল্পনা ছিল, তা বর্তমানে দক্ষিণ গাজার রাফাহ এলাকাকেন্দ্রিক একটি অস্থায়ী ক্যাম্প নির্মাণে এসে ঠেকেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই পাইলট প্রকল্পে গাজার ২০ লাখেরও বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষের মধ্যে মাত্র কয়েক হাজার মানুষকে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় দেয়া হবে। ক্যাম্পটি পরিচালনার জন্য একটি ফিলিস্তিনি প্রশাসন, স্থানীয় পুলিশ বাহিনী এবং একটি ছোট আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবাহিনী মোতায়েনের কথা রয়েছে। তবে বছরের শেষের আগে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে দ্য গার্ডিয়ানকে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।

রাফাহর কাছে প্রস্তাবিত ক্যাম্পের নির্মাণকাজ এখনো শুরু হয়নি। স্যাটেলাইট চিত্রে কিছু মাটি খননের চিহ্ন দেখা গেলেও নতুন কোনো স্থাপনা নির্মাণের প্রমাণ মেলেনি। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসরাইলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। আগামী ২৭ অক্টোবর দেশটিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর ধারণা, নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার বড় ধরনের কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী নয়; বরং নির্বাচনের আগে গাজায় নতুন করে সর্বাত্মক সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে। গত অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পরও ইসরাইল নিয়মিত বিমান হামলা চালিয়েছে, যাতে এক হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। একই সাথে ইসরাইলি বাহিনী বর্তমানে গাজার ৬০ শতাংশের বেশি এলাকা সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করছে।

ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের গবেষক মুহাম্মদ শেহাদা এই প্রকল্পের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তার মতে, এটি মূলত একটি প্রতীকী প্রকল্প, যা ইসরাইল আন্তর্জাতিক মহলে ইতিবাচক ভাবমর্যাদা তৈরির জন্য ব্যবহার করতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, অল্পসংখ্যক মানুষের জন্য উন্নত সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করে বাকি গাজার মানুষের দুর্ভোগ আড়াল করার চেষ্টা হতে পারে।

অন্য দিকে হামাস নিরস্ত্রীকরণ প্রশ্নেও আলোচনা চলছে। কায়রোতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে হামাস, ইসরাইল-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং বোর্ড অব পিসের প্রতিনিধিরা অস্ত্র জমা দেয়ার সম্ভাব্য পদ্ধতি, অস্ত্র সংরক্ষণ এবং নিরাপত্তাকাঠামো নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে ইসরাইল যেহেতু গাজায় নিয়মিত বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং গাজার আরো ভেতরে অগ্রসর হচ্ছে, তখন নিরস্ত্রীকরণ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির সম্ভাবনা খুবই কম বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

বোর্ড অব পিসের মূল পরিকল্পনা ছিল অনেক বেশি বিস্তৃত। চলতি বছরের জানুয়ারিতে জ্যারেড কুশনার ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, মাত্র ১০০ দিনের মধ্যে গাজাজুড়ে পানি, বিদ্যুৎ, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, হাসপাতাল, বেকারি এবং অন্যান্য মৌলিক অবকাঠামো পুনরুদ্ধার করা হবে। কিন্তু কয়েক মাসের অচলাবস্থার পর সেই পরিকল্পনা বাস্তবে একটি ছোট পাইলট প্রকল্পে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। দুই সপ্তাহ আগে সাইপ্রাসে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এই নতুন পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়।

বর্তমান পরিকল্পনায় রাফাহ সীমান্তবর্তী বাফার জোনে বহনযোগ্য কেবিন দিয়ে একটি ক্যাম্প নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। সেখানে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবাহিনী ও বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত ফিলিস্তিনি পুলিশ নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে। বাহিনীটির সদস্যসংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার হতে পারে, যা প্রাথমিক পরিকল্পনার তুলনায় মাত্র এক-চতুর্থাংশ। মরক্কো, কসোভো, আলবেনিয়া ও কাজাখস্তান থেকে সদস্য নেয়ার চিন্তা করা হলেও তাদের প্রশিক্ষণ এবং আইনি কাঠামো চূড়ান্ত করতে আরো কয়েক মাস সময় লাগবে। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেছেন, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি চালু করা গেলেই সেটিকে বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

অর্থায়ন নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার জন্য প্রতিশ্রুত ১৭ বিলিয়ন ডলারের খুব সামান্য অংশই এখন পর্যন্ত বাস্তবে পাওয়া গেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্যালেস্টাইন ডোনার গ্রুপ সম্প্রতি ৮৮৩ মিলিয়ন ইউরো সংগ্রহের ঘোষণা দিলেও তা মূলত পানি, পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো মৌলিক অবকাঠামো পুনর্গঠনে ব্যয় হবে। একই সাথে ইসরাইল জব্দ করে রাখা প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের ফিলিস্তিনি কর রাজস্বের একটি অংশ প্রকল্পে ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছে বোর্ড অব পিস, যা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, এই অর্থ ফিলিস্তিনিদের বৈধ সম্পদ এবং কোনো শর্ত ছাড়াই তা ফিরিয়ে দিতে হবে। এ দিকে ফিলিস্তিনি প্রশাসনের প্রতিনিধিরা সতর্ক করেছেন, সীমিত আকারের কোনো প্রকল্প গাজার চলমান মানবিক বিপর্যয়ের স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। তাদের মতে, মানুষের জীবন রক্ষার প্রতিটি উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা কখনোই পুরো গাজা পুনর্গঠনের বিকল্প হতে পারে না। একই সাথে জাতীয় কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজার (ঘঈঅএ) সদস্যদের মধ্যেও বিভক্তি দেখা দিয়েছে। অনেকের আশঙ্কা, রাফাহর এই ক্ষুদ্র প্রকল্পটি গাজার অধিকাংশ বাস্তুচ্যুত মানুষকে আরো পিছিয়ে দেবে এবং সীমিত সহায়তার জন্য নতুন মানবিক সঙ্কট সৃষ্টি করতে পারে।

গাজায় থামছে না ইসরাইলি হামলা

শিশুসহ হতাহতের সংখ্যা বাড়ছেই

গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরাইলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। গতকাল শুক্রবার গাজা সিটির আল-ইয়ারমুক স্ট্রিটে একটি আবাসিক ভবনে ইসরাইলি ড্রোন হামলায় মোহাম্মদ তাইসির ওবেইদ নিহত হন এবং নারী-শিশুসহ অন্তত ছয়জন আহত হন। একই দিনে গাজার উত্তরাঞ্চলের তুফ্ফাহ ও জাবালিয়া এলাকায় গোলাবর্ষণ এবং খান ইউনুসের পূর্বে আল-কারারা এলাকায় সীমিত স্থল অভিযান চালায় ইসরাইলি বাহিনী। রাফাহ উপকূলেও গোলাবর্ষণ ও বাস্তুচ্যুতদের তাঁবু লক্ষ্য করে গুলি চালানোর খবর পাওয়া গেছে। ইসরাইলি দৈনিক হারেৎজ’র বরাতে আনাদোলু জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি হামলায় অন্তত ২৭৪ ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে, অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন একজন করে শিশু প্রাণ হারিয়েছে। পত্রিকাটি আরো জানায়, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত নিহত শিশুর সংখ্যা ২১ হাজার ছাড়িয়েছে। অধিকাংশ শিশু বিমান হামলায় নিহত হলেও স্নাইপার গুলি, ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে এবং চিকিৎসার অভাবেও অনেকের মৃত্যু হয়েছে। ক্ষুধা ও রোগে মারা যাওয়া শিশুদের এ পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে ইসরাইলি হামলায় এক হাজার ১২৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং তিন হাজার ৬৪৩ জন আহত হয়েছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলমান যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭৩ হাজার ২৫০ এবং আহতের সংখ্যা এক লাখ ৭৩ হাজার ৭৫১ জনে পৌঁছেছে। একই সাথে গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

পশ্চিমতীরে বসতি সম্প্রসারণ ও দখলদারদের হামলা নিয়ে জাতিসঙ্ঘের উদ্বেগ

অধিকৃত পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা এবং অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে উদ্বেগ আরো বেড়েছে। গতকাল শুক্রবার রামাল্লার উত্তরে সিনজিল শহরের উপকণ্ঠে শতাধিক ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী হামলা চালিয়ে কৃষিজমিতে আগুন দেয় এবং বাসিন্দাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। স্থানীয় মেয়র মুয়তাজ তাওয়াফশাহ আনাদোলুকে জানান, স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিরক্ষা কমিটির সদস্যরা প্রতিরোধ গড়ে তুললে হামলাকারীরা শহরে প্রবেশ করতে পারেনি। একই সময়ে ইসরাইলি সেনাবাহিনী শহরের প্রবেশপথ বন্ধ করে অবরোধ জোরদার করে।

এ দিকে ইসরাইলের অবৈধ গিভাত জেভ বসতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে শহরের মর্যাদা দেয়ার সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। তার মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক বলেন, প্রশাসনিক মর্যাদা পরিবর্তন করলেও আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে ‘গিভাত জেভ’ অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে থাকবে। তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, পশ্চিমতীর ও পূর্ব জেরুসালেমে ইসরাইলি বসতিগুলোর কোনো আইনি বৈধতা নেই এবং এগুলো আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাবের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। জাতিসঙ্ঘের মানবিক সংস্থা ওসিএইচএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনিদের আহত হওয়ার ৫৫ শতাংশ ঘটনার জন্য বসতি স্থাপনকারীদের হামলাই দায়ী। বর্তমানে পশ্চিমতীর ও পূর্ব জেরুসালেম মিলিয়ে প্রায় সাত লাখ ৫০ হাজার ইসরাইলি অবৈধ বসতিতে বসবাস করছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় অন্তত এক হাজার ১৮১ ফিলিস্তিনি নিহত, প্রায় ১৩ হাজার আহত এবং প্রায় ২৪ হাজার মানুষ গ্রেফতার হয়েছেন।