সূচকের বড় উন্নতিতে শুরু করলেও দিনশেষে টিকল সামান্যই

পুঁজিবাজারে মৌলভিত্তির কোম্পানি আনার চেষ্টা

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

সূচকের বড় উন্নতি দিয়ে দিন শুরু করা পুঁজিবাজার গতকাল দিনশেষে তা ধরে রাখতে পারেনি। দিনের মাঝামাঝি সময়ে বিক্রয়চাপের কারণে উভয় বাজারই সূচকের নামমাত্র উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। এর আগে রোববার সূচকের বড় ধরনের অবনতির পর গতকাল দিনের শুরুতে পুঁজিবাজারগুলোর ইতিবাচক আচরণ বিনিয়োগকারীদের মাঝে নতুন করে আশা জাগালেও শেষরক্ষা হয়নি। বেলা বারোটার পর বড় ধরনের বিক্রয়চাপের ফলে বৃদ্ধি পাওয়া সূচকের প্রায় সবটাই হারিয়ে বসে বাজারগুলো।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ নিয়ে একটি দেশের মধ্যস্থতায় শান্তিচুক্তির কথা বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে উঠে আসলে তা বিনিয়োগকারীদের নতুন করে আশান্বিত করে তোলে। এর প্রতিক্রিয়ায়ই গতকাল দিনের শুরুতে সূচকের বড় উত্থান দেখা যায়। তবে তারা মনে করেন, যুদ্ধ বন্ধ হওয়া বা শান্তিচুক্তি নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য না থাকায় বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ মুনাফা তুলে নিতে সক্রিয় হলে বিক্রয়চাপ বৃদ্ধি পায়। এটাই শেষদিকে সূচককে নিম্নমুখী করে তোলে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ১০ দশমিক ২৬ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। পাঁচ হাজার ১১২ দশমিক ২৭ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি সোমবার দিনশেষে স্থির হয় পাঁচ হাজার ১২২ দশমিক ৫৩ পয়েন্টে। তবে লেনদেন শুরুর বিশ মিনিটের মাথায় সূচকটি পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ১৮৭ পয়েন্টে। এ সময় সূচকটির উন্নতি রেকর্ড করা হয় ৭৩ পয়েন্টের বেশি। পৌনে ১১টার দিকে ডিএসই সূচক নেমে আসে পাঁচ হাজার ১৫১ পয়েন্টে। এ সময় বৃদ্ধি পাওয়া সূচকের ৩৯ পয়েন্ট টিকে থাকে। এখান থেকে ফের ঊর্ধ্বমুখী হওয়া সূচকটি সাড়ে ১১টার দিকে আবার পাঁচ হাজার ১৭৬ পয়েন্টে উঠে যায়। এভাবে আবার ৬২ পয়েন্টে উন্নতি রেকর্ড করা হয় সূচকটির। সূচকের এ অবস্থান থেকেই শুরু হয় প্রচণ্ড বিক্রয়চাপ যা অব্যাহত ছিল লেনদেনের শেষ সময় পর্যন্ত। এতে বৃদ্ধি পাওয়া সূচকের মাত্র ১০ দশমিক ২৬ পয়েন্টই টিকে থাকে। একই সময় বাজারটির বিশেষায়িত দুই সূচকের মধ্যে ডিএসই-৩০ সূচকটি ৯ দশমিক ১১ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হলেও ডিএসই শরিয়াহ সূচকটি ০ দশমিক ৭৩ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়।

অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ৮ দশমিক ২৭ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। ১৪ হাজার ৪৭৩ দশমিক ০৯ পয়েন্ট থেকে যাত্রা করা সূচকটি সকাল সাড়ে ১১টার পর ১৪ হাজার ৫৩২ পয়েন্টে পৌঁছে যায়। এ সময় সূচকটির উন্নতি রেকর্ড করা হয় প্রায় ৬০ পয়েন্ট। কিন্তু এর পরই শুরু হয় বিক্রয়চাপ যা দিনশেষে সূচকের বড় অংশের অবনতি ঘটায়। টিকে থাকে মাত্র ৮ দশমিক ২৭ পয়েন্ট। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচকের মধ্যে সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৬৯ দশমিক ৮৮ ও ৬ দশমিক ৬৩ পয়েন্ট।

সূচকের পাশাপাশি গতকাল দুই পুঁজিবাজারেই লেনদেনের অবনতি ঘটে। ঢাকায় এদিন ৪৭০ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয় যা আগের দিন অপেক্ষা ৪২ কোটি টাকা কম। রোববার ডিএসই’র লেনদেন ছিল ৫১২ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে ৪৩ কোটি টাকা থেকে ৩১ কোটিতে নেমে যায় লেনদেন।

এ দিকে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বলেছেন, দেশের বৃহৎ পাবলিক ইন্টারেস্ট কোম্পানিগুলোকে সরাসরি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার বিষয়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এ প্রক্রিয়ায় সরকারসহ বাজার সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন তিনি। রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিএসইসির মাল্টিপারপাস হলে আয়োজিত শেয়ারবাজার অংশীজনদের ষষ্ঠ মাসিক সমন্বয় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

সভায় উপস্থিত ছিলেন বিএসইসির কমিশনার মু. মোহসিন চৌধুরী, মো: আলী আকবর, ফারজানা লালারুখ ও মো: সাইফুদ্দিনসহ সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের শীর্ষ প্রতিনিধিরা।

বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘মার্জিন বিধিমালা, ২০২৫; মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা, ২০২৫ এবং পাবলিক অফার অব ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ রুলস, ২০২৫ এই তিনটি বিধিমালার মাধ্যমে শেয়ারবাজারের আইনি সংস্কারের বড় অংশ সম্পন্ন হয়েছে।’ তিনি আরো জানান, শিগগিরই করপোরেট গভর্ন্যান্স সংক্রান্ত নতুন বিধিমালাও প্রণয়ন করা হবে। সংস্থাটির পরিচালক ও মুখপাত্র মো: আবুল কালাম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

সভায় শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উন্মুক্ত আলোচনা হয়। এর মধ্যে ছিল বাজার উন্নয়নের চলমান উদ্যোগ, বাজারকে ফ্রন্টিয়ার থেকে ইমার্জিং মার্কেটে উন্নীত করার পরিকল্পনা, ই-কেওয়াইসি বাস্তবায়ন, কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালু, প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং পাবলিক ইন্টারেস্ট কোম্পানির জন্য সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করে তালিকাভুক্তির উদ্যোগ।

এ ছাড়াও আলোচনায় উঠে আসে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিতকরণ, সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিসিবিএল)-এর রেজিস্ট্রেশন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ শিক্ষা সম্প্রসারণ, নতুন পণ্য চালু ও বৈচিত্র আনা, বাজারে কারসাজি প্রতিরোধ, ইনভেস্টর প্রটেকশন ফান্ডের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের সহায়তা এবং প্রাইস সেনসেটিভ ইনফরমেশনের যথার্থতা নিশ্চিতকরণ। পাশাপাশি নেগেটিভ ইকুইটি ও আনরিয়েলাইজড লসের সমাধান এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও সুরক্ষা জোরদার করার বিষয়েও গুরুত্ব দেয়া হয়।

সমন্বয় সভায় অংশ নেন শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা। এদের মধ্যে ছিলেন সিসিবিএলের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব:) মো: ওয়াহিদ-উজ-জামান, ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: সাইফুর রহমান মজুমদারসহ অন্যরা।