পানিশূন্য তিস্তার ধু-ধু বুকে চলছে হালচাষ

Printed Edition
bangla-2
লালমনিরহাটে তিস্তা নদীর বুকে জেগে উঠা চরে হালচাষ করছেন এক কৃষক : নয়া দিগন্ত

আসাদুল ইসলাম সবুজ লালমনিরহাট

অক্টোবর এলেই পানিশূন্য হয়ে পড়ে তিস্তা নদী। এক সময়ের খরস্রোতা এ নদীর বুক যথারীতি এবারো বিস্তীর্ণ বালুচরে পরিণত হয়েছে। উজান থেকে আসা বিপুল পরিমাণ বালি ও পলিতে নদীর তলদেশ ভরাট হওয়ায় তিস্তার স্বাভাবিক প্রবাহ এখন নেই বললেই চলে। ফলে রংপুর বিভাগের ৩৫টি উপজেলার কয়েক লাখ কৃষক চরম অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছেন। প্রত্যাশিত তিস্তার পানি চুক্তি না হওয়ায় রংপুর বিভাগের ৩৫টি উপজেলার কয়েক লাখ কৃষক ফসল আবাদ নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন।

হিমালয় থেকে উৎপন্ন তিস্তা নদী ভারতের সিকিম, দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি হয়ে বাংলাদেশের লালমনিরহাটের পাটগ্রামের দহগ্রাম দিয়ে প্রবেশ করেছে। এরপর বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে এটি নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধা অতিক্রম করে ব্রহ্মপুত্রে গিয়ে মিলিত হয়েছে। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার দোয়ানিতে তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণের পর ১৯৯০ সালে তিস্তা সেচ প্রকল্প চালু হয়। তবে গত ৩৫ বছরে নদীর তলদেশ দুই থেকে আড়াই মিটার পর্যন্ত ভরাট হয়ে গেছে।

ফলে নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিপাত বা উজানের ঢলেই দুই তীর উপচে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ে। এতে প্রায়ই আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষি, যোগাযোগ ও অবকাঠামো। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় বন্যার বিপৎসীমা ৫২ দশমিক ৪০ মিটার থেকে বাড়িয়ে ৫২ দশমিক ৬০ মিটার নির্ধারণ করা হয়। তবে বাস্তবে নদীটি আরো দ্রুত ভরাট হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণের পর থেকেই তিস্তার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলেই শুষ্ক মৌসুমে তীব্র পানিসঙ্কট এবং বর্ষায় ভয়াবহ বন্যা এখন বাংলাদেশের ওই অঞ্চলের জন্য নিয়মিত দুর্যোগে পরিণত হয়েছে।

তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্প সূত্র জানায়, প্রকল্প এলাকায় সেচ ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে ব্যারাজ পয়েন্টে কমপক্ষে ২০ হাজার কিউসেক পানি প্রয়োজন। এর মধ্যে শুধু সেচ কার্যক্রম চালাতে দরকার ১৪ হাজার কিউসেক পানি। অথচ বর্তমানে তিস্তায় পানি রয়েছে মাত্র সাড়ে তিন হাজার কিউসেক। ফলে ব্যারাজের সব কপাট বন্ধ রেখে সেচ প্রকল্পে পানি সরবরাহ করায় ভাটিতে নদীর প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এতে রংপুর বিভাগের বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষকরা চাষাবাদ নিয়ে হতাশায় ভুগছেন।

তিস্তার চরাঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, বছরের অধিকাংশ সময় নদীটি শুকনোই থাকে। বর্ষায় অল্প সময়ের জন্য পানি এলেও শীত মৌসুমে তা মরুভূমির মতো ফেটে যাওয়া বালুচরে রূপ নেয়। বর্তমানে তিস্তার বুকে জেগে উঠেছে অন্তত ৫৮টি চর। এসব চরে কৃষকরা আলু, ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, গাজর, মিষ্টি কুমড়া ও বিভিন্ন শাক-সবজি চাষ করছেন। অনেকেই তিস্তা নদীর বুকে হালচাষ করে আসন্ন মৌসুমের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার গোকুন্ডা ইউনিয়নের চরগোকুন্ডা গ্রামের আক্কাস আলী (৫০) প্রায় এক দশক ধরে চরে হালচাষ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তিনি বলেন, নদীভাঙনে ঘরবাড়ি আর জমিজমা হারিয়েছি। এখন অন্যের জমিতে হালচাষ করি। তিস্তা নদীতে পানি নেই, মাছও নেই- শুধু ধু-ধু চর আর চর।

চরের আরেক কৃষক শফিকুল ইসলাম (৪৫) জানান, তিস্তার চরে চাষাবাদ অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। আগে নদীর পানি দিয়ে সেচ দেয়া যেত। এখন শ্যালো মেশিনে সেচ দিতে হয়। তেলের দাম বেশি, বালুমাটি পানি ধরে রাখতে পারে না। এতে খরচ বেশি হলেও জীবিকার তাগিদে ফসল ফলাতে হচ্ছে।

তিস্তা নদীরক্ষা আন্দোলন সূত্র জানায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ১০ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা। প্রথম ধাপে (পাঁচ বছর) ব্যয় হবে ৯ হাজার ১৫০ কোটি টাকা, যার মধ্যে ছয় হাজার ৭০০ কোটি টাকা চীন থেকে ঋণ এবং দুই হাজার ৪৫০ কোটি টাকা সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে দেবে।

তিস্তা রক্ষায় গত কয়েক বছরে উত্তরাঞ্চলে একাধিক আন্দোলন হয়েছে। ‘তিস্তা বাঁচাও, উত্তরবঙ্গ বাঁচাও’ স্লোগানে মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি ও মশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। সম্প্রতি নদীর ১১৫ কিলোমিটারজুড়ে ৪৮ ঘণ্টাব্যাপী অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীরা।

তিস্তা নদীরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক ও বিএনপি কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে তিস্তাপাড়ের মানুষকে সাথে নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

এ বিষয়ে লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক ড. মো: সাইখুল আরিফিন জানান, তিস্তার চরাঞ্চলের মাটিতে পলি জমে থাকায় তা অত্যন্ত উর্বর। কম রাসায়নিক সার ব্যবহার করেও ভালো ফলন পাওয়া যায় এখানে। ভুট্টা, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, সরিষা ও শাক-সবজি চাষে কৃষকরা তুলনামূলক লাভবান হচ্ছেন।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তার পানিপ্রবাহ নিশ্চিত না হলে সেচ, কৃষি ও জীববৈচিত্র্য- এ সবই চরম ঝুঁঁকিতে পড়বে। তাই দ্রুত পানি বণ্টন চুক্তি কার্যকর ও মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি জানান তারা।