- মো. আনোয়ারুল ইসলাম শামীম
বাংলাদেশে ব্যবসা করতে গিয়ে কিংবা সাধারণ নাগরিক হিসেবে সরকারি কোনো দপ্তরের দ্বারস্থ হলে একটি বাক্য আমাদের খুব পরিচিত—“এটা আইনে নেই, করা যাবে না।” আইন দেখালে কখনো বলা হয়, “আইনে আছে, কিন্তু বিধিতে নেই।” বিধির কথা তুললে বলা হয়, পরিপত্র স্পষ্ট নয়, আবার সবকিছু দেখাতে পারলে শেষ আশ্রয়—ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগবে। এ পর্যন্তও কারো আপত্তি থাকার কথা নেই। রাষ্ট্র পরিচালনায় আইনের সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, বিধিতে ঘাটতি থাকতে পারে, কোনো বিষয়ে ব্যাখ্যার প্রয়োজনও হতে পারে। কিন্তু যে কাজটি সকাল পর্যন্ত আইনে ছিল না, অনৈতিক অর্থের লেনদেনের পর বিকেলে সেটি আইনে আসে কীভাবে? যে কাজটি গতকাল বিধিতে ছিল না, আজ অনৈতিক লেনদেনের পর সেটি করার পথ বের হয় কোন বিধিতে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই মনে হতে পারে, বাংলাদেশে দুর্নীতির সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ সম্ভবত প্রকাশ্যে ঘুষ চাওয়া নয়। আরও ভয়ংকর হলো আইন ও বিধির মধ্যকার অস্পষ্টতাকে পুঁজি করে নাগরিককে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে বৈধ কাজের জন্যও তাকে অবৈধ পথের কথা ভাবতে হয়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ২০২৫ সালের জাতীয় খানা জরিপের পরিসংখ্যান সামনে রাখলে বিষয়টি আর বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতা বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। জরিপে ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ সেবা গ্রহণকারী খানা কোনো না কোনো দুর্নীতির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে, ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশকে ঘুষ দিতে হয়েছে। এক বছরে প্রাক্কলিত ঘুষের পরিমাণ ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকার বেশি। ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ ঘুষদাতা বলেছেন, ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না।
এই একটি পরিসংখ্যানই আমাদের রাষ্ট্রীয় সেবা ব্যবস্থার একটি গভীর অসুখ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। ঘুষ যদি কেবল অন্যায় সুবিধা নেওয়ার জন্য দেওয়া হতো, তাহলে বিষয়টি একরকম ছিল। কিন্তু মানুষ যদি বৈধ সেবা পাওয়ার জন্যই মনে করে ঘুষ দেওয়া ছাড়া উপায় নেই, তাহলে ঘুষ আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ থাকে না, ধীরে ধীরে সেটি রাষ্ট্রীয় সেবার অলিখিত বিধিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। আমার প্রশ্ন তাই খুব সরল—আমাদের দেশে কি আইনের পাশাপাশি আরেকটি অদৃশ্য আইন তৈরি হয়েছে?
একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে। কোনো শিল্পকারখানায় কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান। নিজস্ব জমির মাঝখানে সামান্য সরকারি বা বনভূমি পড়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানটি সেই জমির মালিকানা চাইছে না, দখলও চাইছে না, প্রয়োজন শুধু সীমিত জায়গার ওপর দিয়ে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি বা অন্য কোনো প্রয়োজনীয় সংযোগ নেওয়ার অনুমতি। একটি অনাপত্তিপত্রের অভাবে পরিবেশগত ছাড়পত্র আটকে যেতে পারে, উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়তে পারে, হাজার হাজার মানুষের জীবিকাও অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে।
দেশে সুখাধিকার আইন, ১৮৮২ আছে। সেখানে পথ ব্যবহারের অধিকারসহ সুখাধিকারের আইনি ধারণা আছে। কিন্তু সরকারি সম্পত্তির ক্ষেত্রে কোন পরিস্থিতিতে, কোন কর্তৃপক্ষ, কী পদ্ধতিতে এমন অনুমতি দেবে—তার প্রয়োগ যদি সংশ্লিষ্ট বিধি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থায় দ্ব্যর্থহীন না হয়, তখনই শুরু হয় বিপদ। তখন আইন আর নাগরিকের হাতে থাকে না, আইনের ব্যাখ্যা চলে যায় টেবিলের ওপাশে বসা ব্যক্তির হাতে। তিনি চাইলে বলতে পারেন, “বিধিতে নেই।” ফাইল মাসের পর মাস পড়ে থাকতে পারে। আবার কোনো অদৃশ্য সমঝোতার পর যদি সেই একই কাজের পথ হঠাৎ বেরিয়ে আসে, তখন আমি জানতে চাই—নতুন কোনো বিধি কি রাতারাতি জারি হয়েছিল, নাকি টাকারই এমন অলৌকিক ক্ষমতা আছে যে বিধির শূন্যস্থানও পূরণ করে দিতে পারে?
এখানেই আমাদের প্রশাসনিক দুর্নীতির একটি গভীর অর্থনীতি লুকিয়ে আছে। আমরা ঘুষ বলতে সাধারণত খামের ভেতরের টাকা দেখি। কিন্তু ফাইলের ওপর জমে থাকা ধুলোও কখনো কখনো ঘুষের ভাষা হতে পারে। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ফাইল ছয় মাস আটকে রাখুন। এই ছয় মাস ব্যাংকের সুদ থেমে থাকে না, শ্রমিকের বেতন থামে না, কারখানার স্থায়ী ব্যয় থামে না, আমদানি করা যন্ত্রপাতির অপচয় থামে না, ঋণপত্রের দায়ও থেমে থাকে না। থেমে থাকে শুধু একটি স্বাক্ষর। এই একটি স্বাক্ষরের জন্য ব্যবসায়ীর প্রতিদিনের ক্ষতি যত বাড়তে থাকে, তার অসহায়ত্বও তত বাড়ে। আর অসহায় মানুষকে অনৈতিক সমঝোতার দিকে ঠেলে দেওয়া অনেক সহজ।
ইচ্ছাকৃত দীর্ঘসূত্রতাও দুর্নীতির একটি অত্যন্ত কার্যকর অস্ত্র হতে পারে। একই বাস্তবতা আর্থিক খাতেও দেখা যায়। ধরুন, একটি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে পুনঃঅর্থায়নের জন্য আবেদন করেছে। আবেদন করার দিন তার ঋণের মেয়াদসহ প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ছিল। কিন্তু আবেদন নিষ্পত্তি করতে কর্তৃপক্ষের ছয় মাস লেগে গেল। ছয় মাস পর বলা হলো, এখন আর ঋণের অবশিষ্ট মেয়াদ নির্ধারিত শর্ত পূরণ করছে না।
আমি জানতে চাই—বিলম্ব করল কে, আর শাস্তি পেল কে?
আবেদনকারী সময়মতো আবেদন করেছে। সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। অথচ কর্তৃপক্ষের বিলম্বের আর্থিক দায় বহন করবে ব্যবসায়ী! এ কেমন প্রশাসনিক ন্যায়বিচার? বড় শিল্পপ্রকল্পে বিষয়টি আরও জটিল। একটি কারখানার যন্ত্রপাতি একটি ঋণপত্রে আসে না। বিশটি, ত্রিশটি কিংবা আরও বেশি ঋণপত্রে আসতে পারে। অর্থ ছাড়ের তারিখও ভিন্ন। তাহলে পুনঃঅর্থায়নের মেয়াদ কোন তারিখ থেকে গণনা হবে—প্রথম অর্থ ছাড়, শেষ অর্থ ছাড়, প্রতিটি ঋণের পৃথক তারিখ, নাকি প্রকল্প চালুর সময় থেকে?
নীতিমালা যদি এই প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর না দেয়, তখন উত্তর নির্ধারণ করেন ব্যক্তি। আর কোটি টাকার সুবিধা যখন একটি ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে, তখন অস্পষ্টতাই হয়ে ওঠে দুর্নীতির সবচেয়ে মূল্যবান পুঁজি। এই কারণেই ঘুষকে শুধু নৈতিক অবক্ষয় বলা যাবে না। ঘুষ বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর একটি অঘোষিত কর। ২০২৫ সালে প্রাক্কলিত ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকার ঘুষ রাষ্ট্রের কোষাগারে যায়নি, কিন্তু মানুষের পকেট থেকে গেছে। একজন ব্যবসায়ী এই অর্থ দিলে সেটি তার উৎপাদন ব্যয়ে যোগ হয়। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে পণ্যের মূল্য বাড়ে। শেষ পর্যন্ত ভোক্তা সেই মূল্য দেয়। আর রপ্তানি বাজারে সেই অতিরিক্ত ব্যয় পণ্যের দামে যোগ করা না গেলে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে। অর্থাৎ ঘুষের মূল্য শুধু ঘুষদাতা দেয় না। ভোক্তা দেয়, শ্রমিক দেয়, বিনিয়োগ দেয়, কর্মসংস্থান দেয়—শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র দেয়। আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অসংখ্য বক্তৃতা দিয়েছি, কিন্তু দুর্নীতির সবচেয়ে বড় কারখানা—অস্পষ্টতা ও জবাবদিহিহীন ক্ষমতা—ভাঙতে পারিনি।
আমি মনে করি, এর সমাধান খুব কঠিন নয়। সরকারি কর্মকর্তা যদি বলেন, “আইনে নেই”, তাহলে তাকে লিখে দিতে হবে—কোন আইনের কোন ধারায় নেই। যদি বলেন, “বিধিতে নেই”, তাহলে লিখে দিতে হবে—কোন বিধির কোন বিধানের কারণে আবেদনটি গ্রহণযোগ্য নয়। আর যদি বলেন, “করা সম্ভব নয়”, তাহলে লিখে দিতে হবে—কেন সম্ভব নয় এবং কোথায় আপিল করা যাবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, প্রতিটি সরকারি আবেদনের নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকতে হবে। সেই সময় পার হলে ফাইল স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে যাবে। আর কর্তৃপক্ষের বিলম্বের কারণে কোনো নাগরিক বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তার আইনগত বা আর্থিক যোগ্যতা হারালে সেই দায় আবেদনকারীর ঘাড়ে চাপানো যাবে না।
মৌখিক আইনের বাংলাদেশ থেকে আমাদের লিখিত জবাবদিহির বাংলাদেশে যেতে হবে। কারণ মুখের কথায় “আইনে নেই” বলা সহজ, কাগজে আইনের ধারা লিখে একই কথা বলা অনেক কঠিন।
আমি কাউকে অভিযুক্ত করতে চাই না। আমি একটি ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করতে চাই।
যে কাজ টাকা না দিলে আইনে নেই, টাকা দিলে সেটি কোন ধারায় আইনে আসে?
যে অনুমোদন গতকাল বিধিতে ছিল না, আজ সেটি কোন বিধিতে বৈধ হয়?
যে কর্মকর্তার গতকাল ক্ষমতা ছিল না, আজ তার সেই ক্ষমতা কোথা থেকে আসে? রাষ্ট্র যদি এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারে, তাহলে সাধারণ মানুষের মনে ভয়ংকর একটি বিশ্বাস জন্ম নেবে—এই দেশে বুঝি দুটি আইন আছে।
একটি বইয়ের আইন, আরেকটি টেবিলের নিচের আইন। বইয়ের আইনে ধারা আছে, টেবিলের নিচের আইনে দর আছে। বইয়ের আইনে বিধি আছে, টেবিলের নিচের আইনে বিনিময় আছে।
একটি সভ্য রাষ্ট্রে এর চেয়ে ভয়ংকর পরাজয় আর কী হতে পারে?
আমি এমন বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে একজন নাগরিককে তার বৈধ অধিকার পেতে কোনো কর্মকর্তার অনুগ্রহ কিনতে হবে না, একজন উদ্যোক্তাকে কারখানা সচল রাখতে আইনের বাইরে আরেকটি অদৃশ্য খরচের হিসাব রাখতে হবে না।
রাষ্ট্রের উত্তর একটিই হওয়া উচিত—
আইনে যা আছে, তা-ই হবে—আপনি টাকা দেন বা না দেন।
কারণ যেদিন ঘুষ আইন ও বিধির ঘাটতি পূরণ করতে শুরু করে, সেদিন দুর্নীতি আর শুধু আইন ভাঙে না—দুর্নীতিই ধীরে ধীরে অলিখিত আইনে পরিণত হয়।
লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ রিফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ারকন্ডিশনিং মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (ব্রামা)।