চীনের সহায়তায় চলতি অর্থবছরেই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু : সংসদে পানিসম্পদমন্ত্রী
বাজেট আলোচনায় নাহিদ ইসলাম
Printed Edition
সংসদ প্রতিবেদক
- ঋণখেলাপী ও গণহত্যাকারীদের অপরাধ আমি ভিন্নভাবে দেখি না
- ফ্যামিলি কার্ডের জন্য কাউকে তদবির করতে হবে না : সমাজকল্যাণ মন্ত্রী
জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম সরকারকে উদ্দেশ করে তীব্র সমালোচনা ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কাঠামো সংস্কারের দাবি তুলে ধরেছেন। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি বলেন, ঋণখেলাপি ও গণহত্যাকারীদের অপরাধ আমি ভিন্নভাবে দেখি না। একসময় যারা রিকশায় চড়তেন, এখন তারা প্রাডোতে চড়েন, বিএনপিদলীয় এক এমপির বক্তব্যের রেশ ধরে তিনি অভিযোগ করেন, জেলে থাকা অবস্থায়ও বর্তমান সরকারদলীয় অনেক নেতার সম্পদ কয়েক গুণ বেড়েছে। যারা এক সময় ধান ও পাট ক্ষেতে পালিয়ে ছিলেন, তাদের প্রকৃত সম্পদের হিসেব স্থানীয় মানুষই জানেন।
গত রাতে জাতীয় সংসদের বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
নাহিদ ইসলাম ‘জুলাই অভ্যুত্থান জাদুঘর’ প্রসঙ্গ তুলে বলেন, সরকারি দলের কেউ কেউ জুলাই অভ্যুত্থান জাদুঘর চালু হোক চান না শুনি। ৫ আগস্টের মধ্যে এই জাদুঘর চালু করার কথা ছিল এবং তা বাস্তবায়ন জরুরি। একই সাথে তিনি গণভোটের রায় অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে।
সীমান্তে ‘পুশইন’ ইস্যু নিয়ে সংসদে আলোচনা করতে চাইলেও তা আটকে দেয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কার্যকর সংসদীয় আলোচনা না হওয়া উদ্বেগজনক।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ভারতের নতুন হাইকমিশনার তিনি বাংলাদেশ ও ভারতের ‘আকাশ-জমিন এক করে ফেলেছেন। মিষ্টি কথায় চিঁড়ে ভিজে না। সম্পর্ক হতে হবে মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে। বাংলাদেশের তরুণদের কাজে লাগানো, প্রশিক্ষণ দেয়া এবং বিদেশে দক্ষ কর্মী হিসেবে পাঠানোতে আরো গুরুত্ব দিতে হবে। একই সাথে ইসলামী ব্যাংক দখলসহ বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও।
এনসিপি প্রধান সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে ঘাটতি ও অবাস্তব বলে মন্তব্য করেন। তার মতে, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনযোগ্য নয় এবং সরকার ‘স্বপ্নবিলাসী’ পরিকল্পনার মাধ্যমে অর্থনীতি পরিচালনার চেষ্টা করছে। অর্থনীতি আবেগ দিয়ে চালানো যায় না; বরং উৎপাদন, বণ্টন, ভোগ ও বিনিয়োগের সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন, যা বর্তমান বাজেটে অনুপস্থিত।
২০০৮ সালের পর দীর্ঘ ১৬ বছরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়েছে মন্তব্য করে তিনি এই সময়কালে দলীয়করণ, সিন্ডিকেট ব্যবস্থা এবং অলিগার্ক শ্রেণীর উত্থান ঘটেছে, যার ফলে ব্যাংকিং খাতে লুটপাট এবং হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। তরুণদের কর্মসংস্থান সঙ্কটকে বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রধান সমস্যা।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ কেবল সরকারি চাকরিতে নয়, বরং সমাজের সামগ্রিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান ছিল। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গণ-অভ্যুত্থান ঘটেছে এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি নিয়েও তিনি বলেন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর হাতে নগদ অর্থ গেলে তা মূলত ভোগে ব্যয় হয়, যা অর্থনৈতিক প্রবাহ তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলে না। এই সময়ে প্রয়োজন ছিল ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ এবং তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি করা। ব্যাংকিং খাত প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, ঋণখেলাপিদের আবারো সুযোগ দেয়া হচ্ছে। অর্থ পাচারের অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে কেবল বিদ্যমান আইনে সমাধান সম্ভব নয়। কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সংস্থার সম্পৃক্ততায় ব্যাংক দখলের ঘটনাও ঘটেছে, যা নতুন আইনি কাঠামো ছাড়া সমাধানযোগ্য নয়। বিদ্যুৎ খাত নিয়ে তিনি বলেন, ক্যাপাসিটি চার্জ ও বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয়ের অসামঞ্জস্যপূর্ণ কাঠামোর কারণে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি এবং লোডশেডিংয়ের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও শিল্প উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সেই আদানি ও অন্যান্য বিদ্যুৎ চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।
প্রতিরক্ষা ও অন্যান্য খাতে বাজেটে পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনা নেই বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং সাংবিধানিক সংস্কার ছাড়া অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যকর হবে না। বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি।
সীমান্ত পরিস্থিতি ও হত্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি সংসদে এসব বিষয়ে আলোচনা না হওয়ার সমালোচনা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শক্ত অবস্থান প্রত্যাশা করেন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের একাধিক রাজনৈতিক বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়েছে, যার জবাব রাষ্ট্রীয়ভাবে দেয়া প্রয়োজন। একই সাথে নতুন ভারতীয় হাইকমিশনারের অতীত সম্পর্কের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান ও ব্যাখ্যা থাকা উচিত।
চলতি অর্থবছরেই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু
চীনের সহায়তায় চলতি অর্থবছরেই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের মাধ্যমে এ প্রকল্পে চীনের কারিগরি সহায়তা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে। বাজেট আলোচনায় তিনি বলেন, তিস্তা, পদ্মা, মেঘনা ও যমুনাসহ দেশের প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার নদীভাঙন এলাকায় মানুষ কষ্টে আছে। তাদের জীবন-জীবিকা রক্ষায় সরকার কাজ করছে। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনগণ উপকৃত হবে। মন্ত্রী জানান, তিস্তা ও ধরলা অববাহিকার মানুষের জন্য চলতি অর্থবছরেই মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু হবে। চীন সফরে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার আশ্বাস পাওয়া গেছে এবং ফিজিবিলিটি স্টাডি চলছে। কৃষি উন্নয়ন ও জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনা রয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ডের জন্য তদবির করতে হবে না
মহিলা, শিশু ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা: এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, গত ফ্যাসিস্ট সরকার বাজেট ঘোষণা করে দেশর অর্থ বিদেশে পাচার-লুটপাট করেছে। দেশের ব্যাংক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আর বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী যে বাজেট ঘোষণা করেছেন, সেটি বাস্তবায়িত হবে স্বচ্চতা ও সাথে। এখানে লুটপাট তো দূরের কথা, কেউ এ চিন্তাও করতে পারবে না। তিনি বলেন, ৪১ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেয়া হবে। এটি ৩০০ আসনেই দেয়া হবে। এ ক্ষেত্রে কাউকে কোনো তদবির করতে হবে না। বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে যারা এই কার্ড প্রাপ্য, তাদের দেয়া হবে। সংসদ সদস্যরা শুধু মনিটরিং করবেন।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ বাজেট স্বপ্ন নয়- বাস্তবায়ন যোগ্য।
এ দিকে বাজেট আলোচনায় আরো বক্তব্য রাখেন- প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আহমেদ আযম খান, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।